রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতিতে এনবিআর
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৭:৪১:০৯ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক: রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে থাকা যেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়তি। এবার আরও পিছিয়ে পড়ল সংস্থাটি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। এই ঘাটতি এনবিআরের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ। এর আগে কখনও এত ঘাটতি হয়নি এনবিআরে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, উচ্চাভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এনবিআরের পক্ষে অর্জন সম্ভব নয়। বিগত সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইন-শৃঙ্খলাজনিত কারণে স্থবির হয়ে পড়া ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিক গতি না আসা, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, আমদানি কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ— সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। এই কারণগুলো সরাসরি প্রভাব ফেলছে রাজস্ব আদায়ে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) লক্ষ্যমাত্রা থেকে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। আলোচ্য ৯ মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এ সময়ে আহরিত হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা।
জানা গেছে, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। দিন দিন বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। এমনকি ঋণ পরিশোধেও ফের ঋণ করতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার এই পর্যায়ে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন ব্যয় তা খুব আহামরি নয়। মূলত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ পর্যাপ্ত না হওয়ায় কারণেই এ টানাপড়েন। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ সামর্থ্যরে অর্ধেকেরও কম। রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না এগোনোর ফলে অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবপুঁজি গঠন, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্নয়নে পর্যাপ্ত অর্থের জোগান অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না।
জানা গেছে, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে রাজস্ব আহরণ হতাশাজনক। কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে একেবারে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ পিছিয়ে। জিডিপির অনুপাতে করের অংশ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। নীতিনির্ধারকরা এ নিয়ে আশাবাদী থাকেন। অথচ বাস্তবতা তার বিপরীত। গত এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত না বেড়ে বরং কমে এসেছে।
জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে রাজস্ব আহরণে আরও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত হলো রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। আইএমএফের এমন শর্তের মুখে এত বিশাল ঘাটতিতে পড়ল এনবিআর। লক্ষ্য অর্জনে অর্থবছরের বাকি সময়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা কর আদায়ের চাপ এনবিআরের ওপর।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো শুল্ক-কর আদায় বাড়ানো। কিন্তু বাস্তবতা বেশ ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজস্ব খাতের যে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা-ও ঝুলে গেছে।
বিশাল রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে। বাজেটের মাধ্যমে সরকারের খরচের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এনবিআরের মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকট, তেলের দাম বৃদ্ধিসহ নানামুখী সংকটের মধ্যে আছে ব্যবসা-বাণিজ্য।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পুরনো রাজস্ব প্রশাসন দিয়ে এত বিশাল লক্ষ্য অর্জন কঠিন। এ জন্য সংস্কার প্রয়োজন। এ কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। রাজস্ব খাত সংস্কার করে অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তা বিল আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেনি বিএনপি সরকার। ফলে অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব খাতের মতো ‘অরাজনৈতিক’ সংস্কারেও পিছু হটছে। যদিও দেশের অর্থনীতির জন্য এ সংস্কার খুবই জরুরি। এ ছাড়া আইএমএফের একটি উল্লেখযোগ্য শর্ত ছিল রাজস্ব খাত সংস্কার। সেটিও আটকে গেল। এতে আইএমএফের ঋণের কিস্তি পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিদেশি উৎস থেকে সরকারের অর্থ পাওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল।
রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্য অর্জনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবসা বাণিজ্যের গতি স্বাভাবিক করা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আছে। ব্যবসা বাণিজ্য শ্লথ হয়েছে। আমদানি কমেছে। নতুন বিনিয়োগও তেমন একটা আকৃষ্ট হচ্ছে না। এসব কারণে রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত হারে হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, আগে থেকেই রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে আছে দেশ। অর্থনীতি গতিপ্রকতৃতির সঙ্গে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। একদিকে আয় বাড়ছে না, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে। ফলে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারকে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেন তিনি। এমনকি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কমিয়ে আনার কথাও বলেছেন তিনি।
জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের নয় মাসে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। ৯ মাসে ঘাটতি হয় সাড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা। আমদানি খাতে ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা ঘাটতি হয়। গত জুলাই-মার্চ মাসে ভ্যাট বা মূসক আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের শেষ ৩ মাসে (এপ্রিল, মে ও জুন) আদায় করতে হবে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে ৭১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা আদায় না করলে লক্ষ্য অর্জন হবে না।




