অব্যবস্থাপনাই বাড়িয়েছে জ্বালানি সংকট
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৭:৪১:৫৯ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক: সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে দেশে পর্যাপ্ত তেল আছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, মে মাস পর্যন্ত দেশের জ্বালানি তেলের প্রয়োজনীয় জোগান নিশ্চিত; অথচ পাম্পগুলোতে মানুষের ভোগান্তি কমছে না। সরকারের একাধিক মন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন ‘প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে কেনার প্রবণতায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। গত প্রায় এক-দেড় মাস ধরে একই কথা বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্বালানি তেল বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি তেল সরবরাহে সরকার এখনও পরিকল্পিত কোনো ব্যবস্থা চালু করতে পারেনি। কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেও সেগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে না। ফলে জ্বালানি তেল থাকলেও অব্যবস্থাপনার কারণে সংকট বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জ্বালানি তেল বিক্রিতে সরকার লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি করে ফেলেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সরকার কিছু জায়গায় পরীক্ষামূলক ফুয়েল পাস চালু করেছে। তবে জ্বালানি তেল এমন একটি পণ্য যা প্রায় সব ক্ষেত্রে লাগছে। পরিবহন ছাড়াও শিল্প কারখানা, কৃষি, নৌযান— প্রায় সবক্ষেত্রে জ্বালানি তেল প্রয়োজন। ফলে কোনো পরিকল্পিত ব্যবস্থা চালু করতে না পারায় সংকট বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট বিশ্বব্যাপী। তবে আমাদের এখানে সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে অব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বড় সংকট। তিনি বলেন, সরকার বলছে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নাই। অথচ উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে পেট্রলপাম্পগুলোতে। তিনি বলেন, সরকার বলছে প্যানিক বায়িং, আবার বলছে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছে। এসব চিহিৃত করার দায়িত্বও সরকারের। সরকার কেবল দায় দিয়ে বসে থাকলে হবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বও সরকারের।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি তেল যাতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি না কেনে সেই লক্ষ্যে দাম বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের কাছে খবর আছে যে পেট্রলপাম্পে এখন ভিড় আগের চেয়ে কমেছে। সামনের দিকে সেই ভিড় আরও কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন। এ কর্মকর্তা আরও বলেন, সরকার এমন একটা প্রক্রিয়া চালু করার চেষ্টা করছে যেখানে কোনো গাড়ি কতটুকু তেল সংগ্রহ করল সেটা যাতে ডাটাবেজে থাকে। তবে এ সংকট যেহেতু বাংলাদেশে নতুন, তাই বিষয়টি কার্যকর করতে সময় লাগবে। তবে তিনি স্বীকার করেন— যেহেতু এখন স্ক্রিনিং করার কোনো প্রক্রিয়া নাই, ফলে একই মোটরসাইকেল বা গাড়ি ঘুরে ঘুরে সারাদিন তেল সংগ্রহ করছে। এ তেল বিক্রি করে এক ধরনের ব্যবসা চালু করেছে।
এদিকে মানুষের ভোগান্তি কমাতে জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়িয়েছে সরকার। বিপিসি বলছে, সোমবার থেকে সারাদেশে অকটেনের পরিমাণ অন্তত ২০ শতাংশ, পেট্রল ১০ শতাংশ এবং ডিজেল ১০ শতাংশ বেশি সরবরাহ করা হয়েছে। গত বছরের মাসওয়ারি তেল বিক্রির পরিমাপকে চলতি বছরের তেল বিক্রির বেঞ্চমার্ক নির্ণয় করেছে সরকার। মার্চ থেকে সেই হিসাব করেই তেল সরবরাহ করে আসছে। অর্থাৎ গত বছর যে ডিলার বা ক্রেতা যতটুকু জ্বালানি তেল মার্চ মাসে সংগ্রহ করেছে চলতি বছরও তাকে সেই পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। সেই হিসাবে গত বছর এপ্রিল মাসে ডিলার বা গ্রাহকদের যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছে চলতি বছর এপ্রিলে বিশেষ করে সোমবার থেকে আরও ২০ শতাংশ বেশি হারে অকটেন, ১০ শতাংশ করে বেশি ডিজেল ও পেট্রল বেশি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবু মাঠের অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতোপূর্বে লাভ করার পরেও সাময়িক সংকটর দেশের অর্থনীতির কথা চিন্তা না করে দাম বাড়িয়ে দেওয়াও এক ধরনের অব্যবস্থাপনা। প্রসঙ্গত, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি আমদানি করে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। এর বাইরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে। সম্প্রতি বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি, পরিশোধন ও বিক্রির অনুমতি দিয়েছে সরকার। বিপিসি অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানি করে ১৫ লাখ টন। বাকিটুকু পরিশোধিত জ্বালানি তেল। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ডিজেল, যা মোট সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তবে লাভ বেশি আসে অকটেন, পেট্রল আর জেট ফুয়েল বিক্রি করে। জিটুজি পদ্ধতি আর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছ থেকে চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি তেল কেনে বিপিসি।




