সিলেটজুড়ে হাম : হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ মে ২০২৬, ১০:০৭:৪৬ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেটে ক্রমশই বাড়ছে হাম উপসর্গে মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে শিশু। সরকারী হাসপাতালে বাড়ানো হয়েছে পিআইসিইউ ও বেড সংখ্যা। এরপরও হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জায়গা দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা। খালি না থাকায় এক বেডে একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পিআইসিইউ এর জন্য মুমূর্ষ শিশুকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে দৌঁড়াচ্ছেন অভিভাবক। সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত হাম উপসর্গে ২৬ শিশু মারা যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ, এর মধ্যে ৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরো বেশী হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই রোগীর চাপ বাড়ছে। জ্বর, সর্দি-কাশি, শরীরে র্যাশ ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ নিয়ে একের পর এক শিশু ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে। সোমবার বিকেল পর্যন্ত সিলেটে হামের বিশেষায়িত শহীদ ডা. সামসুদ্দিন হাসপাতালে ১০০ শয্যার বিপরীতে ১২০ জন রোগী ভর্তি রয়েছে।
সোমবার বিকেলে হাসপাতালের আরএমও ডা. মিজানুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, বেড খালি না থাকায় শামসুদ্দিন হাসপাতাল থেকে ৫২ জন রোগীকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। যে কারণে চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরও রোগীদের সেবাদানে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের ৮ জন চিকিৎসক ও নার্সরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
এদিকে রোগীর অতিরিক্ত চাপে সিলেটের হাসপাতালে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রকে (পিআইসিইউ) বাড়িয়ে ২২ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। সোমবার ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষায়িত শামসুদ্দিন হাসপাতালেও আরো একজন শিশু চিকিৎসক উপজেলা থেকে এনে সংযুক্ত করা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কোথাও এক শয্যায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য মতে, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হাম আক্রান্ত সন্দেহে মোট ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া শেষ ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৫ জন শিশু।
সরেজমিনে শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, হামের রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে একসঙ্গে ১৪ জন শিশুকে অ্যাম্বুলেন্সে করে স্থানান্তর করা হয় এখানে। স্থানান্তরিত সব শিশুর শরীরেই হামের উপসর্গ ছিল বলে জানা গেছে। ওসমানী হাসপাতাল থেকে একসঙ্গে ১৪ জন শিশুকে অ্যাম্বুলেন্সে করে শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালে পাঠানো নিয়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটিকে বিশেষায়িত করে শুরু থেকেই হাম রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছে। রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তাই শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকেই গাদাগাদি করে রাখতে হচ্ছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের টিকা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, শিশুদের সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং দেরিতে হাসপাতালে আনার কারণেই এবার জটিলতা ও মৃত্যুহার বেড়েছে। এ থেকে মুক্তি পেতে টিকা কার্যক্রম জোরদার ও সচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করেন তারা
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘন্টায় ল্যাব পরীক্ষায় ৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে বিভাগে হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫ জন।
এছাড়া বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ২৮০ জন শিশু চিকিৎসাধিন রয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৬ জন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল, ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে ১০, সিলেট উইমেন্স মেডিকেল হাসপাতালে ২, আল হারামাইন হাসপাতালে ১, রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫, মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ১, নর্থ ইস্ট হাসপাতাল ২, পার্ক ভিউ মেডিকেল হাসপাতাল ২, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২, আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩, বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২, দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৬৬, ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০, জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১৫ ও মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২০ জন শিশু চিকিৎসাধিন আছে।
সিলেট বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. নুরে আলম শামীম বলেন, হাম উপসর্গে ভর্তি ও মৃত্যু নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। টিকা কার্যক্রমের প্রতি বেশী জোর দেয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে এই সংখ্যাটা কমে আসবে। কারণ এই সময়ে টিকা কাজ করতে শুরু করবে। যারা এখনো টিকা দেননি তাদেরকে টিকা দেয়ার জন্য আহ্বান জানান তিনি।




