সিলেটের চামড়া ব্যবসায় চতুর্মুখী সঙ্কট: `বকেয়া টাকা না পেলে ব্যবসা করবো কী দিয়ে?’
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ মে ২০২৬, ৫:০০:৪৬ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার: ‘ট্যানারি মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা বকেয়া। এই টাকা না পাইলে ব্যবসা করবো কী দিয়ে? গত ১৬ বছর ধরে আমরা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের পাশে কেউ নাই। সরকার বদলায় কিন্তু চামড়ার সিন্ডেকেট বদলায় না। এবার আমরা ব্যবসা করতে পারব কি না তাও জানি না।’
ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলেন সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ী শাহজাহান মিয়া। তিনি শাহজালাল চামড়া সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
বাজারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাম নির্ধারণ, বকেয়া টাকা না পাওয়া, কওমি মাদরাসারগুলোর চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া নিয়ে চতুর্মুখী সঙ্কটে সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ীরা।
এদিকে পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। এবারের সিদ্ধান্তে লবণযুক্ত গরুর চামড়ায় প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ায় ৩ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে কোরবানি সম্পর্কিত বিষয়াদির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ সভা শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই নতুন মূল্য তালিকা ঘোষণা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, এ বছর ঢাকা মহানগরের ভেতরে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। গত বছর গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ছিল। সেই হিসেবে এ বছর প্রতি বর্গফুটে দাম ২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দাম বাড়ানোর খবরে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কপালে। চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা না বলে চামড়ার দর নির্ধারণ করা হয়। তারা বলেন সরকার একটা দর নির্ধারণ করে দেয়। বাস্তবে তার চারগুণ কমে কিনতে হয় চামড়া। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্যবসায়ীরা বলেন, ব্যবসা করি আমরা সরকার কাদের সঙ্গে আলাপ করে দাম নির্ধারণ করে! ট্যানারি মালিকদের যত সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়। আমরা যারা মাঠ পর্যায়ে চামড়া সংগ্রহ ও প্রথামিক সংরক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি তাদের জন্য কোনো সুযোগ সুবিধা নেই।
সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ী শাহজাহান মিয়া জানান, বিগত ১৬ বছর ধরে তিলে তিলে এই শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে একটি মাঝারি মানের চামড়ার চামড়ার দাম প্রায় ১ হাজার ১১৬ টাকা হয়। আর চামড়া প্রতি প্রক্রিয়া খরচ পরে আরও ২শ থেকে ৩শ টাকা। তার মানে, একটি মাঝারি মানের চামড়ার দাম দাঁড়ালো প্রায় ১৩ থেকে ১৪শ টাকা। এখন গত ১৬ বছরের বাজারের বাস্তবচিত্র কী তা আপনারা জানেন। একটা চামড়া ২শ ৫০ থেকে ৩শ টাকায় বিক্রি হয়। প্রক্রিয়া খরচ একই হলে একটি চামড়ার দাম পরে প্রায় ৬শ টাকা। এই চামড়া আমাদের বিক্রি করতে হয় ৪শ টাকায়। এ হচ্ছে ব্যবসার বর্তমান চিত্র।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় পর্যায়ে ১শ ৫০ থেকে ২শ জন ব্যবসায়ী ছিলেন। এখন তা ৫০/৬০ জনে এসে ঠেকেছে। তাও তারা খাতা কলমে। বাস্তবে ১৫ থেকে ২০ জন এখনও এ ব্যবসা ধরে রেখেছেন। এভাবে চলতে থাকলে তারাও ব্যবসা বাদ দিয়ে দিবেন।
এদিকে, কওমি মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা দেওয়ায় বড় ধরণের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। গত সোমবার (১১ মে) দুপুরে ‘সিলেট বিভাগ কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ’ সংবাদ সম্মেলন করে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
বিগত দুই সরকারের ‘ষড়যন্ত্র ও অকার্যকর সিদ্ধান্ত’ এবং বর্তমান সরকারের উদাসীনতার অভিযোগ তুলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
যদি কওমি মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ না করে তা হলে বড় ধরনের সঙ্কটের কথা জানান ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, আমাদের চামড়া ব্যবসায় সঙ্গে জড়িত লোকবল অনেক কম। সিলেট জেলায় এ বছর লক্ষাধিক পশু কুরবানি হতে পারে। এসব পশুর চামড়া বেশির ভাগই সংগ্রহ করে কওমি মাদরাসাগুলো। এখন তারা যদি চামড়া সংগ্রহ না করে তাহলে ভয়াবহ সঙ্কট দেখা দিতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চামড়া যেহেতু সংগ্রহ করতে হয়। তাই এ চামড়া সংগ্রহে যে জনবল প্রয়োজন তা সরবরাহ করা প্রশাসন কিংবা ব্যবসায়ী কারো পক্ষেই সম্ভব না।
ঢাকার ট্যানারি ব্যবসায়ীদের সেচ্ছাচারিতা ও সিন্ডিকেটরে বলি সম্ভাবনাময় শিল্প ও দেশের লাখ লাখ চামড়া ব্যবসায়ী। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিগত দুই সরকারসহ বর্তমান সরকার সবাই ট্যানারি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত।
এ প্রসঙ্গে চামড়া ব্যবসায়ী শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘ঢাকার ট্যানারি ব্যবসায়ীদের কারণেই চামড়া শিল্পের এ দুরাবস্থা। তারা সরকারের সব সুবিধা নিয়ে আমাদের টাকা বকেয়া রাখে। তারা প্রণোদনা ও স্বল্প সুদে লোন নিয়ে বড় বড় ব্যবসায়ের শেয়ার কেনে। আর আমরা পাওনা টাকাই পাই না।’
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধা এলডব্লিউজি সনদ। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় ট্যানারিগুলো ইউরোপ-আমেরিকায় চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছেও পণ্য বিক্রি করতে পারছে না। দেশের ২০টি ট্র্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেলেও সাভারের চামড়া শিল্পনগরী কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) ছাড়পত্র না থাকায় তারাও রপ্তানি করতে পারছে না।
এ বিষয়টি সামনে এনে শাহজাহান আরও বলেন, ‘তারা (ট্যানারি মালিকরা) আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে পারছে না এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে আমাদের। আমরা চাই সরকরা চামড়া রপ্তানির সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিক। আমরা আমাদের সংগৃহীত কাঁচা চামড়া ৭২ ঘন্টার মধ্যেই রপ্তানি করে নিতে পারবো। এতে মুনাফা কম হলেও ব্যবসায়ীরা বাঁচবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘এ নিয়ে আমরা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। বিসিক সিলেট জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে আমাদের জানাবেন। অবস্থার পরিবর্তন না হলে আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হবে। আমরা আগামী দুই একদিনে মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি উপস্থাপন করবো।’
শাহজালাল চামড়া সমিতির আহ্বায়ক মো. লিয়াকত আলী বলেন, ‘আমাদের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা এখনও ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া পড়ে আছে। এ অবস্থায় নতুন করে বিনিয়োগ করার আগ্রহ নেই। তবুও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে যতটুকু সম্ভব ততটুকু বিনিয়োগ করবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘দাম কমে যাওয়া, বকেয়া পড়ে থাকা, সরকারের সমন্বয়হীনতার কারণে এই ব্যবসা থেকে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। নানা জটিলতার কারণে এখন চামড়া ব্যবসায় আগ্রহ নেই সিলেটের ব্যবসায়ীদের। বছরের পর বছর লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদেরকে। সরকার উদ্যোগ না নিলে এক সময় এই ব্যবসায় আর কেউ থাকবে না।’
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী ও কওমি মাদরাসাগুলোর সঙ্গে আমরা আগামী সপ্তাহে বসবো। সরকারের পক্ষ থেকে এবার লবণসহ বিভিন্ন সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। যাতে করে কেউ কাঁচা চামড়া বিক্রি না করেন। চামড়া একটি মূল্যবান সম্পদ, আমরা চাই ব্যবসায়ীরা যেন ভালো মূল্যে তা বিক্রি করতে পারেন।’
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিও বুধবার ব্রিফিংয়ে জানান, কোরবানির পশুর চামড়া যেন অযতেœ নষ্ট না হয়, সে লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় লবণ পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চামড়া সঠিক উপায়ে সংরক্ষণের জন্য ইতিমধ্যেই মাংস ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন মাদ্রাসার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং সারাদেশে লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।




