বিস্ময়কর দেশ ইরান
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ মে ২০২৬, ১২:০৫:৩২ অপরাহ্ন
সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে ইরান যুদ্ধ নিয়ে একটি গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। এতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে যেমনটি দাবি করেছেন, তার চেয়ে ইরানের সামরিক শক্তি অনেক বেশী রয়ে গেছে। ইরানের যুদ্ধ পূর্ব মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখনো অক্ষত আছে। একইভাবে তাদের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনও রয়েছে। অথচ ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তা নেমে এসেছে ১৮-১৯ শতাংশে। সিআইএ তাদের প্রতিবেদনে আরো জানিয়েছে, যেসব ভূগর্ভস্থ অস্ত্র ভান্ডারের প্রবেশ পথে বোমা হামলা হয়েছিলো, তার প্রায় সবই ইরান আবার চালু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র মেরামত করা হয়েছে এবং যুদ্ধ শুরুর আগে প্রায় প্রস্তুত অবস্থায় থাকা যন্ত্রাংশ থেকে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরী করা হয়েছে। সম্প্রতি জনৈক মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ইরানের অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা সিআইএ’র ধারণার চেয়েও বেশী হতে পারে। ইরানের নেতৃত্ব এখন আরো বেশী কঠোর, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেছে। তারা বিশ্বাস করে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধৈর্য্যকে হার মানাতে পারবে এবং দেশের ভেতরে যে কোন প্রতিরোধ কঠোরভাবে দমন করতে সক্ষম হবে।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন ৫০ কোটি ডলারের তেল রফতানি আয় হারাচ্ছে। তবে রিপোর্ট অনুযায়ী ইরান স্থলপথে তেল পাচারের মাধ্যমে সেই ক্ষতির কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারে। ফলে ৩ থেকে ৪ মাস টিকে থাকার যে হিসাব দেয়া হয়েছে, বাস্তবে সেটি আরও দীর্ঘ হতে পারে।
লক্ষণীয় যে, সিআইএ’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইরানের বাহ্যিক শক্তিমত্তার কিছুটা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তার অন্তনির্হিত অনেক বিষয় এতে উপস্থাপিত হয়নি। বলা বাহুল্য, ইরানী জনগণের ত্যাগ স্বীকার ও চরম মূল্য দেওয়ার বিষয়টি ছাড়া দেশটির টিকে থাকার কোন বিশ্লেষণই সম্পূর্ণ হবে না। ২০১৭ সাল থেকে দেশটিতে প্রকৃত মজুরী অর্ধেকে নেমে এসেছে। রিয়ালের মূল্য কমেছে ৯০ শতাংশ। মধ্যবিত্ত পেশাজীবিরা দলে দলে দেশ ছেড়েছেন। তারপরও সরকারের পতন হয়নি। কারণ তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থেকে আলাদা করতে শিখেছে, শুধুমাত্র একটি আদর্শিকভাবে উদ্বুদ্ধ বিপ্লবী রাষ্ট্রেই তা সম্ভব।
ইরান দুই স্তরের অর্থনীতি ব্যবহার করেছে। একদিকে রয়েছে ভোগ্যপণ্যের জন্য একটি সাধারণ বাজার, অন্যদিকে রয়েছে কৌশলগত খাতগুলো, যেমন তেল, ইস্পাত ও প্রতিরক্ষার জন্য প্রচুর ভর্তুকিযুক্ত, বিনিময়ভিত্তিক ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রটি ‘ইমাম খোমেনি রিলিফ ফাউন্ডেশন’ এর মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য ও ওষুধ বিতরণ করে। এটি এমন একটি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরী করেছে, যা মানুষকে অনাহার থেকে বাঁচায়। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মতে, অবরোধ থাকা সত্বেও ইরানে অপুষ্টির হার মিশরের চেয়ে অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের এতো অবরোধ সত্বেও ইরানে দুর্ভিক্ষ দূরে থাক, অপুষ্টির হারও খুবই কম।
অনেকের মতে, আদর্শবাদী ও দেশপ্রেমিক সাধারণ ইরানী জনগণের নীরবে কষ্ট সহ্য করে যাওয়ার ক্ষমতা ছাড়া দেশটির বর্তমান সাফল্য সম্ভব হতো না। দেখা গেছে, দশকের পর দশক ধরে ইরানী পরিবারগুলো চরম মূল্যস্ফীতি আর ওষুধের ঘাটতি নিয়ে বেঁচে আছে। প্রতিটি প্রহরে মুদ্রার মান কমে যাওয়ার অপমান তারা সহ্য করছে। লাখো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপকের মতো মধ্যবিত্ত পেশাজীবী দেশ ছেড়েছেন। পেছনে ফেলে গেছেন এক শূন্য সমাজ। কিন্তু যারা থেকে গেছেন, তারা নিজেদের মতো করে মানিয়ে নিয়েছেন, যা রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দেয়নি। পাড়া মহল্লায় বিনিময় প্রথা, গোপনে মুদ্রা বিনিময় এবং ছোটখাটো চোরাচালানের এক অনানুষ্ঠানিক ‘কুবিদে’ অর্থনীতি চালু হয়েছে। এগুলোর ইরানীদের টেবিলে খাবার জুগিয়েছে। নারীরা ভর্তুকির আটা দিয়ে রুটি আর দই বানানো শিখেছেন। মেকানিকরা কুড়িয়ে পাওয়া যন্ত্রাংশ দিয়ে গাড়ি ঠিক করেছেন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক সেন্ট্রিফিউজগুলো টিকে আছে, কারণ জনগণ দৈনন্দিন এই কষ্টকে মেনে নিয়েছে। ইরানের এই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা পশ্চিমাদের একই মূল ধারণাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাদের ধারণা ছিলো, আর্থিক বিচ্ছিন্নতা মানেই সরকারের পতন। এর বদলে ইরান দেখিয়েছে যে, একটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও টিকে থাকতে সক্ষম জাতি সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। মার্কিন চাপের মুখে পড়া অন্যান্য দেশগুলোর কাছেও এই ইরানী ‘নিষেধাজ্ঞা প্রতিরোধী’ হওয়ার ধারণাটি একটি ব্লুপ্রিন্ট ও নকশায় পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে ইরান বিশ্বের এক বিস্ময়, এমনটিই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহল।


