একটি সম্ভাবনার মৃত্যু
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ জুলাই ২০২৬, ৯:০৬:৩৪ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম

১৯ জুলাই, ২০২৪, সিলেট তথা সারাদেশের সাংবাদিকদের জন্য একটি বেদনাবিধুর দিন। এদিন বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিভাগীয় নগরী সিলেটের শত বছরের সাংবাদিকতার স্মারক প্রতিষ্ঠান সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য, দৈনিক জালালাবাদ-এর স্টাফ রিপোর্টার ও দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব (সংক্ষেপে এটিএম তুরাব) পুলিশের নির্মম গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন। জুলাই বিপ্লবে নিহত প্রথম সাংবাদিক হলেন তুরাব। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মৃত্যু ঘটে একটি স্বপ্নের, একটি সম্ভাবনার।
চব্বিশের ১৯ জুলাই সিলেট নগরীর রাজপথ দিনভর ছিল উত্তপ্ত। সকাল থেকেই শহরের মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। এদিন সকাল থেকেই পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে থাকে। দুপুরে কালেক্টরেট মসজিদে জুমার নামাজ শেষে মিছিল বের হয়। সেই মিছিলের ছবি তুলতে গিয়েই ঝাঝরা হয়ে যায় তুরাবের বুক। সহকর্মীরা সাথে সাথে তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় ইবনে সিনা হাসপালে।
বিকেল ৩টার দিকে ইবনে সিনা হাসপাতালের ইনফরমেশন সেন্টারে গেলে কর্তব্যরত এক কর্মকর্তা তুরাবের শরীরের সর্বশেষ পরিস্থিতি অবহিত করেন। আঁচ করতে পারি তার শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে। হাসপাতালের ৮ম তলার সিসিইউ ওয়ার্ডে তুরাবের পাশেই যখন নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আওলাদ হোসেন ব্রিফ করছিলেন, তখনই অনুমান করা যাচ্ছিল তুরাবের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ সময় আইসিইউ’র বাইরে অপেক্ষমাণ তুরাবের বৃদ্ধা মাসহ স্বজনদের বিলাপে হাসপাতালের পরিবেশ অনেকটা ভারী হয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যার দিকে চিকিৎসকরা তুরাবকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর হাসপাতালে অনেকটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
লাশ যখন সন্ধ্যায় নিচে নামানো হয়, তখন লাশের পোস্টমর্টেম নিয়ে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠে। কোতয়ালী থানার একদল পুলিশও আসে ঘটনাস্থলে। মৃত্যু নিয়ে পুলিশের সাথে সাংবাদিকদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ লাঠিপেটা করতে উদ্যত হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইবনে সিনা হাসপাতাল ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মাওলানা হাবিবুর রহমান, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী ও ইকরামুল কবির ইকু ভাইসহ আমরা পরিস্থিতি সামলে লাশ নিয়ে ওসমানী হাসপাতালের ‘মরচুয়ারি’তে । সেখানে গিয়ে একটি পক্ষ ফের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় পরদিন ২০ জুলাই পোস্টমর্টেমের সিদ্ধান্ত হয়। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, সেদিন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের সাহসী সিদ্ধান্তের কারণেই তুরাবের লাশের পোস্টমর্টেম করা সম্ভব হয়। সে সময় পোস্টমর্টেম করানো না গেলে এখন হয়তো লাশ তুলে তুরাবের পোস্টমর্টেম করতে হতো। যেটা অন্য জুলাই যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে হয়েছে।
২০ জুলাই হজরত মানিকপীর র. গোরস্থানে প্রথম দফা জানাজা শেষে তার লাশ বিয়ানীবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে, বিয়ানীবাজারে মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করতে গিয়ে পুলিশ বাঁধা দেয়-এটাও সবার জানা। যদিও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপের কারণে পুলিশ সে অবস্থান থেকে সরে আসে।
তুরাবের মৃত্যুর পর সিলেটের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে যে অভাবনীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা সকলের প্রশংসা কুঁড়ায়। আমরা পুলিশের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শহীদ মিনারে সমাবেশে মিলিত হই।
তুরাব হত্যার বিষয়ে আমরা যখন কোতয়ালী থানায় মামলা করতে যাই, তখন পুলিশ আমাদের মামলা নেয়নি। পুলিশ এটি জিডি হিসেবে রেকর্ড করতে চায়। যদিও পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশনায় মামলাটি দাখিল হয়।
তুরাব হত্যার সময় সিলেট প্রেসক্লাবের বর্তমান সভাপতি ও দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক জনাব মুকতাবিস উন নূর লন্ডন সফরে ছিলেন। সেখানকার মিডিয়ায় তিনি এ হত্যাকান্ডের বিষয়ে জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন। আমাদের কাছে রিপোর্ট ছিল ‘তিনি দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতারও করা হতে পারে।’ অবশ্য, এরপর চব্বিশের ৫ আগস্ট পুরো প্রেক্ষাপট বদলে যায়। তুরাব হত্যার বিষয়ে সিলেট প্রেসক্লাবসহ সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী, প্রধান উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। কিন্তু, তুরাবের মামলাটি এখনো তেমন গতি পায়নি। এমনকি তার সব হত্যাকারী আজো গ্রেফতার হয়নি।
তুরাব ছিল-এজন সংগ্রামী যুবকের প্রতিকৃতি। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন-এটাই দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর প্রত্যাশা।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সিলেট প্রেসক্লাব।






