কয়েক সেকেন্ড জন্য বেঁচে গেলাম
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ জুলাই ২০২৬, ৯:০৯:১১ অপরাহ্ন
আশকার আমিন রাব্বি:

খুব ভয় আর আতংকিত সময় ছিল জুলাই-আগষ্ট। আন্দোলনের শুরু দিকে মনে হচ্ছিল কিছু দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। যা অন্য ১০-৫ টা আন্দোলনের মতো। কিন্তু না আন্দোলন ক্রমে বাড়তে থাকে। প্রথম প্রথম শুধু শাবি-তে হতো পরে আস্তে আস্তে শাবি’র বাহিরে চলে আসলো। প্রথমে তেমন কিছু না বুঝলেও পরে বুঝতে পারলাম আন্দোলন বেগবান হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ১৮ তারিখ শাবিপ্রবির গেইটে মিছিল রাস্তা অবরোধ চলছে একটা পর্যায়ে পুলিশ একশনে গেলো ছাত্রদের উপর। শুরু হয় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া যা অনেকক্ষণ চলে, বিকেলের দিকে যুবলীগ, ছাত্রলীগের সশস্ত্র মিছিল নিয়ে হামলা চালায় এবং মুহুর্মুহু গুলি করে। বিজিবি গেইটে পাশে তুরাব আমি অনেকক্ষণ একসাথে কাজ করি।
শুক্রবার ১৯ জুলাই, তুরাবের রক্ত আমার বুলেটপ্রুফ জেকেটে লেগে ছিল। সকালে থেকে ভাবছি আজ কোথায় যাবো কি ছবি তুলবো। ঠিক তখন জুরেজ ভাইর (জুরেজ গুলজার) ফোন। একটু কথা হলো, উনার ফোনেই সাবেক মেয়র (বর্তমানে শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী) আরিফুল হক চৌধুরী কথা বললেন আমার সাথে। তিনি ফোন রাখার পরে মনে হলো বিএনপির আজ মনে হয় কোনো কর্মসূচি আছে কোর্ট পয়েন্টে। আবার ফোন দিলাম, খবর নিলাম আরিফ ভাই কোথায় জুম্মার নামাজ পড়বেন। জুরেজ ভাই জানালো কালেক্টরেট মসজিদে। তখনই প্রথম আলোর আনিস মাহমুদের সাথে আলাপ হলো, সে যাবে শাবি গেইটে গায়বানা জানাজায়। তারপর মানবজমিনের মাহমুদকে কল দিয়ে বললাম বিএনপি মনে হয় আজ কোট পয়েন্ট প্রোগ্রাম করবে। সে বললো ভাই আমি মিরাবাজার, আসতেছি একসাথে নামাজ পড়বো। শুক্রবার কালেক্টরেট মসজিদে জুম্মার নামাজ একসাথে গেলাম মসজিদে ঢুকে বিএনপির বেশ কিছু নেতৃবৃন্দকে দেখলাম। মনে মনে ভাবলাম ছবি তো হবে। ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে তুরাব মাহমুদকে কল দিলো, মাহমুদ তাকে জানালো আমাদের অবস্থান। তখন তুরাব নাকি বলছে সে আসতেছে। নামাজ শেষ বেরিয়েই দেখা সহকর্মী এটিএম তুরাবের সাথে, ১ মিনিট কথা হয়। এদিকে বিএনপি প্রস্তুতি নিচ্ছে মিছিলের জন্য। এরমধ্যে পুলিশের ২ টি গাড়ি দূর্গাকুমার স্কুলের দিক থেকে এসে কোর্ট পয়েন্টের পাশে বনফুলের সামনে থামলো। মিছিল শুরু, আমি ডায়াবেটিস হাসপাতালের গলির সামনের রাস্তার ডিভাইডারের উপরে উঠলাম। ঠিক আমার ডান পাশে তুরাবও উঠলো মিছিলের সম্মুখ ভাগ চলে যাওয়ার পরে আমি নিচে নামলাম রাস্তার মধ্যেখানে যাওয়া মাত্র বনফুলের সামন থেকে পুলিশ গুলি ছুড়া শুরু। আমি দৌড়ে ডায়াবেটিস হাসপাতালের গলির সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি পাশে আশ্রয় নিই। গুলি এসে সিএনজি ও পাশের দোকানে পড়ছে। ঠিক তখনই তুরাব এসে আমাকে ঝাঁপটা দিয়ে ধরে বলে ভাই আমারে বাঁচান আমার চোখে গুলি লাগছে, তখনো পুলিশ অনবরত গুলি করছে। তাকে বলি একটু ধৈর্য ধরো সব ঠিক হবে। একটু দূরে মধুবন এর সামনে আরো থাকা ২ জন সহকর্মী মাহমুদ ও মুহিত মামাকে ডাকলে তারা ছুটে আসেন, তারপর আমরা পুলিশের এডিসি দস্তগীরকে বলি আমরা সাংবাদিক গুলি করবেন না। এরপর প্রথমে একটি রিকশা উঠিয়ে মুহিত মামা নিজে চালিয়ে পরে অবশ্য সিএনজি ড্রাইভার পাওয়ার পরে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়। তখন আমরা তুরাবকে বলছি তুমি যেতে পারবে কি সে বললো পারবো আপনারা থাকেন। ঐ সময় দৈনিক জালালাবাদ এর ফটো সাংবাদিক হুমায়ুন কবির লিটন ভাইকে বেশ কয়েকটা কল করার পর ফোন ধরেন। তাকে বললাম মেডিকেল যাওয়ার জন্য এবং আরো ২/৩ জনকে কল করে বলি দ্রুত মিডিকেল যাওয়ার জন্য। আমরা তো ঐ সময় জানি তুরাবের কপালে ইট লাগছে। তখনও গুলি চলছে। আমরা ৩জন ছাড়া আর কেউ ঐ সময় ছিলনা। একপাশে পুলিশ মুহুর্মুহু গুলি করছে আর অন্য দিকে বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী প্রতিহত করছে। আস্তে আস্তে আমরা সিটি পয়েন্ট দিকে সরতে শুরু করি। ঐখানে যাওয়ার পর বেশ কিছু মানুষ ছিল ঠিক তখন একজন লোক আমাকে বললো আপনার হাত থেকে রক্ত পড়ছে। সাথে সাথে আমি দেখি, পরে কে একজন পানি দিয়ে ধুয়ে দিছে। তখন ডিসি অফিসের সমনে বিজিবির অবস্থান। দেখলাম ফটো সাংবাদিক মুহিত মামা হাঁটতে পারছে না উনার পায়ে আঘাত লেগেছে। আমরা ৩ জন সিটি কর্পোরেশন ভিতর ঢুকলাম, ততক্ষণে ৩জনের অবস্থা একদম কাহিল। তখন পুলিশ গ্রেফতার করছে গুলি করছে। একটু শান্ত হলে মাহমুদকে বললাম এখন চলো আর থাকা ঠিক হবে না। তখন আমরা ২ জন কালেক্টোরেট মসজিদে দিকে হাঁটা শুরু করি, একটু যাওয়ার পর বুঝলাম হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে পা জ¦লছে হাতেও ব্যথা করছে. তখন মাহমুদ ও বললো তারও সমস্যা হচ্ছে। মোটরসাইকেল নিয়ে রওয়ানা দিয়ে একটু যাওয়ার পর ২ জনে সিদ্ধান্ত নিলাম ডাক্তার দেখাতে। পরে এক বড় ভাই ডাক্তারকে কল দিলে উনি বলেন তাড়াতাড়ি উনার হাসপাতালে যাওয়ার জন্য। গিয়ে মোটামুটি চিকিৎসা নিয়ে আমি বাসায় চলে আসলাম। কিছুক্ষণ পর ফটো সাংবাদিক রেজা রুবেলকে কল দিলাম, সে জানালো তুরাবের রক্ত লাগবে ২ ব্যাগ। আমি তাকে বললাম কপালে ফাটলো আর রক্ত কেনো লাগবে তখনই বললো তুরাবের শরীরে অনেক গুলি লাগছে। আমিতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই। কিছুক্ষণের মধ্যে সে জানালো মাহমুদ নাকি আপাতত রক্ত ম্যানেজ করেছে। আমি তাকে বলি যে ছবি ঢাকায় পাঠিয়ে আসছি। তখন আমার শরীরে প্রচন্ড ব্যথা করছে কিন্তু তুরাবের খবরটা ঘরে বলিনি। একদিকে অসুস্থ মা আবার ঘরের সকলে টেনশন করবে আমাকে নিয়ে। কিছুক্ষণ পরে খবর পেলাম তুরাবকে ওসমানী থেকে ইবনে সিনায় আনা হচ্ছে। আমি বেরিয়ে সিলেট মিররে ঢুকলাম। তখন সম্পাদক আহমেদ নূর চাচা বলেন তুরাবের কি অবস্থা উনাকে সব কিছু বললাম। উনি বললেন সাবধানে কাজ করার কথা। ঠিক তখনই মাহমুদের কল, ফোন রিসিভ করে আমি বাকরুদ্ধ। সাথে সাথে ইবনে সিনা হাসপাতালে রওনা হই। নয়াসড়ক পয়েন্ট গিয়ে ফটো সাংবাদিক নূরুল ২ তাকে সাথে নিয়ে যাই। হাসপাতালের আইসিইউতে ঢোকে তুরাবের ঝাঝরা হওয়া নিথর শরীরটা দেখে খুব কষ্টে নিজেকে সামল দেই। তারপর পোস্টমর্টেম ছাড়া দাফন হবে না তাই আবার ওসমানীতে নিয়ে যাওয়া হয়। ঐখানে লাশ হিমাগারে রাখা হয়। ২০ তারিখ সকাল ৯ টায় হাজির হলাম ওসমানীর মর্গে। বেশ কিছুক্ষণ পর পুলিশ একজন এসআই আসেন, সুরতহাল হয় আমরা ৩জন আমি, মাহমুদ, মুহিত মামা স্বাক্ষী হলাম। তারপর পোস্টমর্টেম হলো। তখন জানলাম পুলিশের ঐ এসআই সুরতহাল রিপোর্ট ইচ্ছে করে কিছু গাফলতি করেছে। রেজা রুবেল জানালো ডাক্তার সামছুল ভাই বলছেন এটা ঠিক না করলে পোস্টমর্টেম করবেন না। তারপর ঐ এসআইকে আবার আনানো হলো। উনি কিছুটা ঠিক করে দিলে শুরু হয়। তারপর মানিকপীর গোরস্থান গোসল করানো হলো। পরে ঐখানে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হলো। এরপর প্রেসক্লাবে নেওয়া হলো। ঐখান থেকেই তুরাবের বাড়িতে ২য় জানাজা পর বাড়ির পাশেই দাফন সম্পন্ন হয়। তারপর আমরা প্রেসক্লাবে বসলাম সিদ্ধান্ত হলো তার ভাই জাবুর বাদি হয়ে মামলা করবেন। তারপর আমি কবির আহমদ সোহেল ভাই, হুমায়ুন কবির লিটন ভাই উপশহরে উকিল সাহেবের বাসায় যাই। আমি ঘটনার বিবরণ দেই। আমিসহ বেশ কয়েকজন স্বাক্ষী করে মামলা করা হয়। তখন পুলিশ তড়িঘড়ি করে নিজেদের বাঁচাতে মামলা করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপর, যা খুবই দুঃখজনক। পরে তুরাবের ভাই বাদি হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করলে পুলিশ জানায় তারা মামলা করে ফেলেছে। পরবর্তীতে তুরাবের ভাই কোর্টে আবার মামলা করেন। মামলাটি পিবিআই তদন্ত শুরু করছে। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ র্টাইবোনালে মামলা করা হয়, যা তদন্ত চলছে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার স্বাক্ষী দিয়েছি। প্রয়োজন আরো দিবো তারপরেও তুরাবের খুনিদের বিচার হয়।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সিলেট বিভাগীয় ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।






