বঙ্গভবনে বদলের হাওয়া
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ জুলাই ২০২৬, ৪:০৬:২৮ অপরাহ্ন
আজই পদত্যাগ করছেন রাষ্ট্রপতি!
সরকার বলেনি, তবে চাইলে করতে পারেন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জালালাবাদ রিপোর্ট : দু’দিন ধরে যে গুঞ্জনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা সত্যি হতে চলেছে বলেই আভাস মিলছে। পদত্যাগ করতে চলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং এটি এখন সময়ের ব্যাপার। ওদিকে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের খবরে আলোচনা হচ্ছে দেশজুড়ে। নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়েও আছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে মৌখিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বলেছে বিএনপি সরকার। এ সময় কিছুটা সময় চান তিনি।
তবে সরকারের প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বলেনি, তবে তিনি চাইলে পদত্যাগ করতে পারেন। বৃহস্পতিবার ঢাকায় সাংবাদিকদেরকে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, যদি মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত কারণে হোক, যে কোনো কারণে হোক পদত্যাগ করতে চান, সেই অপশন তো উনার আছে। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি।
রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডে গেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সূচি অনুযায়ী তার ২৬ তারিখ ফেরার কথা। তবে তার আগেই অর্থাৎ আজ শুক্রবারই তিনি দেশে ফিরছেন বলে আভাস পেয়েছেন তার দপ্তরের কর্মকর্তারা। এজন্য সরকার থেকে তাকে অনুরোধ করা হয়েছে। এতে আজ দিনের কোন এক সময়ে পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম বৃহস্পতিবার বলেন, পদত্যাগপত্রে এখনো তিনি স্বাক্ষর করেননি। পদত্যগ করলে জানানো হবে।
তবে বঙ্গভবনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, স্পিকার দেশে না থাকায় চাইলেও এখনই পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারছেন না রাষ্ট্রপতি। পদত্যাগটা যার কাছে করবেন তিনি নিজেও দেশে নাই। সুতরাং এখন পদত্যাগের সুযোগও নেই। কত লোক কত কিছু বলবে সেটা ধরে থাকলে তো আর চলবে না।
তবে রাষ্ট্রপতি ‘পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন’ জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটা স্বাস্থ্যগত কারণেই হোক, আর মানসিক কারণেই হোক।
রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ একজনও স্পিকারের দেশে না থাকার বিষয়টি সামনে আনলেন। তিনি বলেন, মহামান্য তার কর্মকর্তাদের বলেছেন, দুয়েক দিনের মধ্যে তিনি বঙ্গভবনের পাট চুকিয়ে ফেলতে পারেন। স্পিকার ফিরলেই সেটা হতে পারে।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেরিয়েছে স্পর্শকাতর তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি এ বছরের ৯ মে লন্ডনে যান এবং ১৮ মে দেশে ফেরেন। সেখানে গিয়ে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। পরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওই ফোনালাপের বিষয়টি জানতে পারে। এরপরই তাকে পদত্যাগের বার্তা দেয় বিএনপি সরকার। লন্ডন সফরের পর সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির দূরত্ব তৈরি হয়।
সরকারের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়, সফরে হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি যোগাযোগ করেছেন। লন্ডন আওয়ামী লীগের এক নেতার মাধ্যমে তিনি ওই সময়ে ভারতে পলাতক হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথাও বলেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ও রাষ্ট্রপতির সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। অর্থবিল সই ও বাজেট অধিবেশন প্রত্যক্ষণ করতে গত ১১ জুন রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদে গেলে সরকারের সংশ্লিষ্ট কেউ তার সঙ্গে সাক্ষাতও করেননি বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
তবে শেখ হাসিনার সাথে ফোনালাপের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন রাষ্ট্রপতি নিজেই। তিনি এটাকে পুরোটাই মিথ্যা বলেছেন। বৃহস্পতিবার বিকালে তিনি একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় এ তথ্য জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, এটি কল্পনার বাইরে।
স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডনে ঘুরে আসেন রাষ্ট্রপতি। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন।
১২ মে কেমব্রিজের রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির এনজিওগ্রাম করা হয়। সে সময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে একটি স্টেন্ট বসানো হয়। এরপর তাকে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল।
নয় দিন পর দেশে ফেরেন রাষ্ট্রপতি। তখন বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বরাতে তার শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক’ বলে জানিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সারসংক্ষেপ ও নথিতে ডিজিটালি অনুমোদন দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। লন্ডনে সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিসের সঙ্গে তার অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাতও হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। দেশে ফিরে ২৭ জুন তিনি জাতীয় সংসদে সফরের অর্জন নিয়ে কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে তার সফরের বিষয়ে অবহিত করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে তারেক রহমান বুধবার পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বা অন্য কোনোভাবে সফরের ফল তাকে অবহিত করেছেন, এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি। এ কারণে অনেকেই বলছেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। সে অনুযায়ী তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা।






