কাজে লাগাতে হবে মক্কাচুক্তির সুযোগ
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯:০৩ অপরাহ্ন
সম্প্রতি বক্তব্য প্রদানকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা জোটে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কোন ঝুঁকি দেখছে না ঢাকা। তিনি এ ব্যাপারে আগে ভাগে দুশ্চিন্তা না করার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, বাঁচার আগে মরার চিন্তা করলে সমস্যা। তিনি মক্কা চুক্তিকে এতোটাই গুরুত্ব দিয়েছেন যে, সেই চুক্তির সাথে বাংলাদেশের টিকে থাকার বিষয় জড়িত বলে ইংগিত দিয়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই ইংগিত অত্যন্ত অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। এর পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ বিদ্যমান, যা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
লক্ষণীয় যে, সৌদী আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশে যে আলোচনা চলছে তা এখন আর কেবল কূটনৈতিক গুঞ্জন নয়। ইতোমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে বলেছেন, এই চুক্তি ‘বিশ^ মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা’ এবং ‘মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি বাংলাদেশের ৪ টি বড়ো কৌশলগত সুবিধার দুয়ার খুলে দিতে পারে। এই সুবিধাগুলোর অন্যতম হচ্ছে, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় উন্নতির বিষয়টি। মক্কা চুক্তির মূলনীতি হলো ন্যাটোর মতো ‘একজনের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যার ভারত ও মিয়ানমারের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত ও বহুবিধ সমস্যা আছে, তার জন্য এটি একটি বিশাল কৌশলগত ছাতা হতে পারে।
এই চুক্তির বলে বাংলাদেশের পক্ষে তুরস্কের উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি, সামরিক শিল্প, সৌদী আর্থিক ও নৈতিক সহায়তা এবং পাকিস্তানের যুদ্ধ অভিজ্ঞতা ও পারমাণবিক সক্ষমতার সুরক্ষা পাওয়া যাবে। এই জোট শুধু একটি নিছক সামরিক জোট নয়। সৌদীআরব বিশে^র বৃহত্তম তেল রফতানিকারক এবং দেশটি বাংলাদেশের প্রায় অর্ধ কোটি শ্রমিকের কর্মস্থল তথা প্রবাসী রেমিট্যান্সের অন্যতম উৎস।
এছাড়া তুরস্ক বাংলাদেশের তৈরী পোশাক ও ওষুধের থেকে কম খরচে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাবে এবং পাকিস্তানের সাথে বাণিজ্যিক তৈরীর সুযোগ বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যে এদেশের শ্রমিকরা আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক সুরক্ষা পাবে। মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ওজন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক। এতোদিন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত: ভারত নির্ভর। মক্কা চুক্তি বাংলাদেশকে সেই ‘একমুখী নির্ভরতা’ থেকে বের করে আনবে। সৌদী-তুরস্ক-পাকিস্তান জোটে বাংলাদেশ হবে চতুর্থ এবং দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রতিনিধি। ফলে ওআইসি, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের দর কষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ বিশে^র তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হওয়া সত্বেও মুসলিম বিশে^র নিরাপত্তা ইস্যুতে আমাদের তেমন কোন ভূমিকা ছিলো না বললেই চলে। মক্কা চুক্তি বাংলাদেশকে সেই সুযোগ দেবে। তবে এক্ষেত্রে ভারতের প্রতিক্রিয়া, পশ্চিমা বিশে^র দৃষ্টিভঙ্গী ও সামরিক জোটের দায়বদ্ধতার মতো ঝুঁকি আছে। কিন্তু একথাও সত্য যে, বিশ^ রাজনীতি এখন আর আগের মত নেই। সার্ক অচল, বিমসটেক ধীর এবং কোয়াড ও ব্রিকস সবাই জোট বাঁধছে। সেই বাস্তবতায় নিরপেক্ষ থাকা মানে পিছিয়ে পড়া। এ অবস্থায় সচেতন ও অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, সরকারকে উপরোক্ত সুবিধাগুলো, সামনে রেখে একটি সাহসী ও হিসেবী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য হুমকি নয়, বরং একটি বড় সুযোগ, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অভূতপূর্ব সুযোগ।




