অভিবাসনে বাংলাদেশিদের নতুন গন্তব্য আফ্রিকা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:৫৬:৪৭ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের সন্ধানে বাংলাদেশিদের অনিয়মিত অভিবাসন এখন আর শুধু পশ্চিমা দেশগুলোকে ঘিরে নেই। ইউরোপের দেশগুলোয় বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের চিত্র দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় থাকলেও অনিয়মিত অভিবাসনের এ প্রবণতা এখন আর শুধু ইউরোপকেন্দ্রিক নয়। অনিয়মিত অভিবাসনে বাংলাদেশিদের নতুন গন্তব্য হয়ে উঠছে আফ্রিকা মহাদেশ।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে (২০২১-২৫) আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও রাজনৈতিক আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদা চেয়ে আবেদন করেছেন ৬০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক। তাদের সিংহভাগই আবেদন করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। তবে সোমালিয়া, মালি, মরক্কো, মিসর, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, নামিবিয়া ও ক্যামেরুনের মতো দেশেও বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রবণতা ইঙ্গিত করে যে কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের সন্ধানে বাংলাদেশীদের অনিয়মিত অভিবাসন এখন আর শুধু পশ্চিমা দেশগুলোকে ঘিরে নেই। সামাজিক পরিসরে আফ্রিকার দেশগুলো নিয়ে নানা নেতিবাচক ধারণা থাকলেও বাস্তবে এসব দেশেই আশ্রয়ের খোঁজ করছেন অনেক বাংলাদেশি। তাদের কাছে আফ্রিকা কেবল কর্মসংস্থানের গন্তব্য নয়, ইউরোপে যাওয়ার ট্রানজিট রুট কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রেসিডেন্সির মাধ্যমে ভবিষ্যতে উন্নত দেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরির পথ হিসেবেও কিছু দেশ ব্যবহৃত হচ্ছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদার জন্য আবেদন করেছেন ৬০ হাজার ৫৪৬ বাংলাদেশি । এর মধ্যে ৮৫০ জন শরণার্থী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন। বাকি প্রায় ৫৯ হাজার ৭০০ জন আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন, যাদের আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন বা নিষ্পত্তি হয়নি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আফ্রিকার তিনটি প্রধান উপ-অঞ্চল পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা, পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা এবং উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন। তবে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের প্রায় পুরো অংশই কেন্দ্রীভূত পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায়, বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকায়।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৫৬১। পরের বছর তা কমে ৯ হাজার ৭১৯ জনে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২৩৯, ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে ৯ হাজার ৩৯৬ ও ২০২৫ সালে আরো কমে ৬ হাজার ৫৪০ জনে নেমে আসে। একই সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশি রিফিউজির সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২০০, ১৫৩, ১৬৯, ১৭৫ ও ১২৩।
এ অঞ্চলের আরেক দেশ সোমালিয়ায় ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই ছয়জন বাংলাদেশি শরণার্থী হিসেবে নথিভুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে নামিবিয়ায় শুধু ২০২৩ সালে পাঁচজন বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর তথ্য পাওয়া গেছে। পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত। মালিতে ২০২১ ও ২০২২ সালে ৩২ জন করে মোট ৬৪ বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর তথ্য পাওয়া গেছে। ক্যামেরুনে ২০২৪ সালে আবেদন করেছেন মাত্র পাঁচজন। এ অঞ্চলের কোনো দেশেই আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশিদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার তথ্য নেই।
উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর তথ্য পাওয়া গেছে মরক্কোয়। ২০২১ সালে দেশটিতে ৭২ জন বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থী ছিলেন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা কমে ১৬ জনে, ২০২৩ সালে ১৪ ও ২০২৪ সালে ১০ জনে নেমে আসে। তবে ২০২৫ সালে তা কিছুটা বেড়ে ১৯ জনে দাঁড়ায়। পাঁচ বছরে মরক্কোয় মোট ১৩১ বাংলাদেশির রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। মিসরে ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর পাঁচজন করে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর তথ্য রয়েছে। তিউনিসিয়ায় ২০২১ সালে ছয়জন ও ২০২২ সালে পাঁচজনসহ মোট ১১ জন এবং আলজেরিয়ায় শুধু ২০২৫ সালে পাঁচজন বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর তথ্য পাওয়া গেছে। উত্তর আফ্রিকার কোনো দেশেই বাংলাদেশিদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার তথ্য নেই।
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় চেয়েছেন। সংখ্যাটি আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। তবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে অনেক দেশে সহজে ভিসা পাওয়া যায় না। এ কারণে কেউ কেউ আফ্রিকার কোনো দেশে গিয়ে স্থায়ী হওয়ার পর সেখান থেকে উন্নত দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সবাই সরাসরি ইউরোপে প্রবেশের সুযোগ পান না। তাই তুলনামূলক কম খরচে বা বিকল্প পথে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশকে বেছে নিচ্ছেন অনেকে।
অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ায় বাংলাদেশীদের একটি অংশ আশ্রয়ের জন্য তুলনামূলকভাবে অভিবাসীবান্ধব দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছেন। এসব দেশে বৈধ অভিবাসীর মর্যাদা বা রেসিডেন্সি কার্ড পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে উন্নত বিশ্বে কর্মসংস্থানের সুযোগ খোঁজার পথও সহজ করতে পারে।







