জাতিসংঘে প্রথমবার তারেক রহমান : প্রত্যাশার দিগন্তে প্রাপ্তি কতটুকু?
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:৩৫:২০ অপরাহ্ন
১১ দেশের রাষ্ট্র-সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক
৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত
জালালাবাদ রিপোর্ট : দীর্ঘ প্রতীক্ষা, পটপরিবর্তন আর সরকার গঠনের পর প্রথম আমেরিকা সফর করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাভাবিকভাবেই সফরের প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে ছিল কোটি চোখ। আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে দেশের অধিকার, জলবায়ু সংকটের আর্তনাদ আর ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে কী বার্তা দিলেন তিনি? জাতিসংঘ সফরে প্রত্যাশা দিগন্তে প্রাপ্তি কী- তা নিয়েই এখন কেবল আলোচনা।
সরকার বলছে, প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার সময়ই বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে ১১টি বিমান কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি তার সফরের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা সই হয়েছে। যদিও তিনি নিজে এ দুটি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেননি।
কেউ কেউ বলছেন, এই দুটি ইস্যুতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যদিও সরকারের দিক থেকে চাপ থাকার দাবি বরাবরই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
এছাড়া তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সময়েই নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আশা করে শেখ হাসিনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত মিলে সিদ্ধান্ত নেবে।
ওদিকে নিউইয়র্কে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নেওয়ায় এর প্রতি অনেকের বিশেষ নজর ছিল এবং তারেক রহমান দেশের ও বৈশ্বিক ইস্যুগুলোকে তুলে ধরার পাশাপাশি তার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যাশাকে সামনে আনার চেষ্টা করেছেন।
সরকারের দিক থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তিসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরেছেন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ইস্যু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন কার্যক্রম ও বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে বলে তারা মনে করেন। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য রেখেছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুর পাশাপাশি ক্লাইমেট জাস্টিস ইস্যু এসেছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব ও তারা কীভাবে কাজ করতে পারে সেটি বলেছেন।
সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোট সাতটি বক্তব্য দেন। এর মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে দেওয়া ভাষণ ছাড়াও সাইডলাইনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে চারটি, বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে একটি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখেছেন তিনি।
এছাড়া তিনি কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সরকারের দিক থেকে বলা হয়েছে।
এর বাইরে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন মাহদী আমিন।
বোয়িং, পরমাণু চুক্তি ও শেখ হাসিনা :
প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি কোনো অংশগ্রহণ না থাকলেও তার আমেরিকা সফরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে আরও ১১টি বিমান কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্ছ্বাস অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে এ বিষয়ে দেওয়া একটি পোস্টে বলা হয়, বিশ্বসেরা বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের আরও ১১টি কেনার চুক্তিতে পৌঁছানোয় বোয়িং ও বিমানকে অভিনন্দন! যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য এটি আরেকটি দারুণ অর্জন, যেখানে লাভবান হবে দুই দেশই।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখেই নতুন উড়োজাহাজ কেনার এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি সফর চলাকালেই নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের একজন কর্মকর্তার ব্রিফিংয়ে উঠে এসেছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গও। ‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিং হওয়ায় খবরে ওই কর্মকর্তার নাম প্রকাশ না করে তার বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে।
সফর নিয়ে বিশ্লেষকরা যা বলছেন :
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে চব্বিশ উত্তর বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশার কথা বলেছেন। সাধারণ পরিষদের অধিবেশন, সাইডলাইন বৈঠক ও উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকগুলোতে তিনি রোহিঙ্গা ইস্যু, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও ক্লাইমেট জাস্টিসসহ বাংলাদেশের জন্য দরকারি ইস্যুগুলো তুলে ধরেছেন। আমার মনে হয় তিনি ডোমেস্টিক ও ইন্টারন্যাশনাল অডিয়েন্সকে উভয়কে লক্ষ্য করেই কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর এটাই প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের প্রথম সফর। ফলে সব ইস্যুই তিনি কাভার করেছেন। হয়তো নিজে একটি সংবাদ সম্মেলন করলে তাতে সফরের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হলো সে সম্পর্কে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি আমরা জানতে পারতাম। কিন্তু লক্ষ্য, ইস্যু ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার যে চেষ্টা ছিল তা ইতিবাচক।
আরেকজন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের যে ভাষণ দিয়েছে সেখানে দরকারি বিষয়গুলো এসেছে এবং তিনি পরিবর্তনগুলো তুলে ধরে কী ধরনের সহযোগিতা আশা করছেন সেটি বলেছেন।





