কবে ফিরবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ? আলো-আঁধারির খেলায় বিপর্যস্ত জনজীবন
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ৫:০০:২৬ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : টাকা দিলে মিলছে ‘কার্ড’, কিন্তু জ্বলছে না বাতি! একদিকে তীব্র গরমে ওষ্ঠাগত প্রাণ আর দিনে-রাতে অন্তহীন লোডশেডিং, অন্যদিকে রিচার্জ করলেই ভুতুড়ে বিলের ধাক্কা। দেশের কোটি গ্রাহকের মনে এখন একটাই ক্ষোভমিশ্রিত প্রশ্ন-টাকাও যাবে, বিদ্যুৎও থাকবে না, এমন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ ভোগান্তি আর কতদিন? কবে মিলবে এই অন্ধকারের গোলকধাঁধা থেকে মুক্তি?”
শহরের মতো গ্রামেও লোডশেডিংয়ের অভিযোগ। বাংলাদেশে বিদ্যুতের মোট পাঁচ কোটির বেশি গ্রাহকের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা তিন কোটি ৭১ লাখ। সেই হিসেবে লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রামে-গঞ্জে-মফস্বলের সাধারণ গ্রাহকরাই বিদ্যুতের বেশি ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন।
বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানাগুলোতেও চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
শিল্পখাতে গ্যাস ব্যবহার করে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কারখানা চালু রাখে, যেটি ক্যাভটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট নামে পরিচিত। গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারাখানায় বিদ্যুতের ঘাটতিও এবছর তুলনামূলক বেড়েছে বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
একজন কারখানা মালিক বিবিসিকে বলেন, আমরা ডিজেল জেনারেটর দিয়ে চালাচ্ছি। সেটার কারণে আমাদের প্রোডাকশন কস্ট অনেক বেড়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে। বিদ্যুতের কারণে প্রোডাকশন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। অনেকের ডিজেল জেনারেটর দিয়ে চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, কারণে এখানে খরচ অনেক বেশি।
তিনি জানান, বিদ্যুতের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের থেকে অর্ডার পেলেও সঠিক সময় কাজ শেষ করতে পারছে না অনেকে, তারফলে চাপ বাড়ছে। বায়ার এয়ার শিপমেন্টের কথা বলছে। অথবা বলছে- যদি তোমরা সময়মত শিপমেন্ট না দিতে পারো আমরা অন্যত্র অর্ডারটা নিয়ে যাবো।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্যাপটিভ পাওয়ারসহ ৩৩ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য হলো নেপাল ও ভারত থেকে আমদানিসহ গ্রিড পর্যায়ে সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে চলতি বছর মে মাসে ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। তবে উৎপাদনে রেকর্ড করার সঙ্গে এবছর লোডশেডিং বা ঘাটতির দিক থেকেও গত কয়েক বছরের মধ্যে রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অফ বাংলাদেশ বা পিজিসিবি’র তথ্যে গত ১০ আগস্ট একদিনে সর্বোচ্চ তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসেবে এ বছর গরমে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সরকার বলছে, প্রাথমিক জ্বালানির সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবছর এলএনজি আমদানিতে সংকটের কারণে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ-জ্বালানির পরিস্থিতির উন্নতি করতে তাদের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। বিদ্যুৎ খাতের দশ বছর মেয়াদি একটি কর্মপরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশে মারাত্মক বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে জরুরী ভিত্তিতে তেলভিত্তিক, আমদানি করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। বিশেষ আইন প্রণয়ন করে বিনা দরপত্রে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নেয় তারা।
দেশে শতভাগ গ্রামে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার কথা বলা হয় ওই সরকারের সময়। স্বল্প-মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়নে নানা প্রচারও তারা করে গেছে।
বাস্তবতা হলো-উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও গ্যাস উত্তোলন বাড়েনি; কয়লা উত্তোলন করা হয়নি, যার ফলে আমদানি নির্ভরতা বেড়েছে। বড় সমস্যা তৈরি হয় ব্যয়বহুল প্রাথমিক জ্বালানি এবং আমদানি নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার কারণে।
এছাড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সময়মতো উৎপাদনে আসেনি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগে ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
এছাড়া উৎপাদন সক্ষমতা থাকা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া বাবদ বিপুল পরিমাণ খরচ বেড়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম সম্প্রতি বিবিসিকে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বলেন, বিদ্যুতের সংকট ক্রমাগত জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যখন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি ছিল তখন সে ঘাটতি পূরণের জন্য উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছিল জরুরী হিসেবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আমাদের যা প্রয়োজন তার থেকে অনেক বেশি উদ্বৃত্ত্ব ক্যাপাসিটি তৈরি করা হয়েছে। তার বিপরীতে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট অন্যান্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে ওই সরকারও আস্তে আস্তে ক্ষীণতর হয়েছে। অন্তর্বতী সরকারের সময় দুর্বল হয়েছে। আর এ সরকারের সময় এখন এসে সমস্যা জটিলতর হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দ্রুত নির্মাণ করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন পরিকল্পনা যথাসময়ে সম্পন্ন করতে পারেনি। শেষ দিকে এসে ডলার ও জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।
অন্তর্বতীকালীন সরকার মোটামুটি পরিস্থিতি সামাল দিয়ে গেলেও দায়দেনা ও ভর্তুকি বেড়েছে। নতুন সরকার এসে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি অবকাঠামোর যান্ত্রিক ত্রুটি মিলে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা, নীতি ও দাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। তার বিশ্লেষণ হলো-বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যয়বহুল জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে গুরুত্ব দিয়েছে। সংস্কার পরিকল্পনা অনুযায়ী জ্বালানি বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে পারেনি, গ্যাসের আমদানি বেড়েছে এবং নবায়নযোগ্য খাত থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারেনি।
বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলার জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেন বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া উদ্যোগে ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে ভারতে আদানির সঙ্গে কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনে চুক্তি নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা আছে।
সিপিডির গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, আমরা যেটা আমদানি করি সেটা মোট বিদ্যুৎ চাহিদার নয় শতাংশের মতো। সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যদি এই মুহূর্তে রিজিওনাল গ্রিডটি সক্রিয় থাকতো এবং আরো বেশি পরিমাণে ক্যাপাসিটি সম্পন্ন হতো, তাহলে কিন্তু আমরা ভারতে আরো যেসমস্ত উদ্বৃত্ব বিদ্যুৎ অন্যান্য যায়গায় রয়েছে, সেটা এই ঘাটতি পূরণের জন্য কিন্তু আমরা জরুরী ভিত্তিতে নিতে পারতাম। সুতরাং রিজিওনাল এই গ্রিডটি আগামীতে আমাদের চিন্তা করতে হবে। দেশের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিকল্পের কথা বলছেন সেটার জন্য প্রস্তুতি পুরোপুরি নেই। যদি ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে আমরা যদি নেপাল থেকে আরো বেশি নবায়ণযোগ্য বিদ্যুৎ আনতে পারতাম তাহলে সেটা আমাদের শিল্প কারখানা অন্যান্য চাহিদা মেটাতে সক্ষম হতো।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রসঙ্গে এম শামসুল আলম আদানি চুক্তির সমালোচনা করে বলেন, এই চুক্তি সংশোধন করে ট্যারিফ কমাতে হবে।





