কলেরা সংক্রমণে বিশ্বে সপ্তম বাংলাদেশ
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ৫:৪৭:১৯ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী কলেরার সর্বোচ্চ সংক্রমণের তথ্য পাওয়া ৪৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। ওই বছর দেশে ২২ হাজারের বেশি কলেরা রোগী শনাক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিশ্বব্যাপী কলেরা বিষয়ক সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
এতে দেখা যায়, যদিও বাংলাদেশে আগের বছরের তুলনায় কলেরার প্রাদুর্ভাব কিছুটা কমেছে, তবুও দেশটি এ রোগে ‘সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত’ দেশের তালিকায় রয়ে গেছে। গত বছর দেশে কলেরা রোগী শনাক্ত হয় ২২ হাজার ৭০৯ জন। আগের বছর ছিল ২৪ হাজার ৭৫৮ জন। অর্থাৎ, সংক্রমণের হার ৮ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। ২০২৩ সালে কলেরা রোগী ছিল ২৩ হাজার ৩৬৯ জন।
গত বছর শনাক্ত হওয়া মোট রোগীর মধ্যে ১২ হাজার ৩৩১ জন বা ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। এতে বোঝা যায় পানিবাহিত ব্যাকটেরিয়াজনিত এই রোগে শিশুরা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কলেরার সংক্রমণ দেখা গেছে ছয়টি দেশে। সেগুলো হলো: ইয়েমেন, দক্ষিণ সুদান, সুদান, কঙ্গো, অ্যাঙ্গোলা ও নাইজেরিয়া। এর মধ্যে অ্যাঙ্গোলা ছাড়া বাকি সবকয়টি দেশ যুদ্ধপীড়িত কিংবা সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত ছিল।
গত বছর বাংলাদেশসহ এই ৭ দেশেই ১০ হাজারের বেশি কলেরা রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণের হিসাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র দেশ বাংলাদেশ। তবে, বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি দেশ থেকে কলেরায় মৃত্যুর কোনো তথ্য পায়নি ডব্লিউএইচও। এসব তথ্য এমন সময় সামনে এলো দেশে যখন কলেরার টিকাদান কর্মসূচি চলমান। গত আগস্টে কলেরার প্রথম দুই ডোজ ওরাল টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ঢাকার ৭ থানা এলাকা এবং নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৭ উপজেলাকে কলেরার জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়।
২০২৫ সালে বিশ্বের ৪৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে কলেরার তথ্য পায় ডব্লিউএইচও। এসব দেশে মোট ৪ লাখ ৫১ হাজার কলেরা রোগী পাওয়া যায় এবং এ রোগে ৭ হাজার ৮৭০ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব তথ্য বিভিন্ন দেশে নজরদারির মাধ্যমে পাওয়া। তাই এতে বিশ্বের কলেরা প্রাদুর্ভাবের সার্বিক চিত্র আসেনি।
ডব্লিউএইচওকে ‘শূন্য’ কলেরা রোগীর কথা জানিয়েছে ৮১ দেশ—অর্থাৎ ওই দেশগুলোতে ২০২৫ সালে কোনো কলেরা রোগী শনাক্ত হয়নি। আর ৭৭টি দেশ কোনো তথ্যই দেয়নি। ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে মোট কলেরা আক্রান্তদের প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশের তথ্য।
এ অঞ্চলের ৫ দেশের তথ্য অনুযায়ী মোট কলেরা রোগী ২৪ হাজার ১৬৯ জন। এর মধ্যে প্রায় ৯৪ শতাংশই বাংলাদেশের। এ ছাড়া, ভারতে ৯২০, মিয়ানমারে ৪৬৮, নেপালে ৫৫ ও থাইল্যান্ডে ১৭ জন কলেরা আক্রান্তের কথা জানা গেছে। ভুটান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং পূর্ব তিমুরে কোনো কলেরা রোগী শনাক্ত হয়নি। পুরো বিশ্বে ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় কলেরার প্রাদুর্ভাব ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে কমেছে মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
তবে জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে সংক্রমণের হার অপেক্ষাকৃত কম ছিল। দেশে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে আক্রান্তের হার ছিল ১২ দশমিক ৯ জন, যেখানে দক্ষিণ সুদান ও ইয়েমেনে এই হার ছিল যথাক্রমে ৬৬২ দশমিক ৩ ও ২২৩ দশমিক ৬ জন।
যোগাযোগ করা হলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক কাজী আহমেদ জাকি জানান, আইসিডিডিআরবি ও আইইডিসিআরের নজরদারির তথ্য দিয়েই ডব্লিউএইচও এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তিনি জানান, অতীতের মতো প্রাণঘাতী না হলেও বাংলাদেশে এখনো কলেরা একটি সমস্যা। আগে এই রোগে যখন বহু মানুষ মারা যেত, তখনকার মতো না হলেও বাংলাদেশে এখনো কলেরা একটি সমস্যা। দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা সহজলভ্য হওয়ায় এ রোগে মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে জানান তিনি।
আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, এখন চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে এবং রোগী শনাক্ত হয়। ডায়রিয়া হলে কী করতে হবে সে বিষয়ে সাধারণ মানুষও সচেতন এবং আগের চেয়ে দ্রুত চিকিৎসা নেন। দেশে কলেরার প্রাদুর্ভাবের পেছনে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির চ্যালেঞ্জগুলোকে এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। তিনি বলেন, দেশে পানি ও স্যানিটেশন সবসময় একটি বড় সমস্যা। পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এগুলো এখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আহমেদ জাকি বলেন, প্রাদুর্ভাব আরও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের চলমান ওরাল কলেরা টিকাদান কর্মসূচি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইসিডিডিআরবির ২০২২-২৩ সালের একটি যৌথ গবেষণায় দেশের ১৪৪টি এলাকাকে (উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের থানা এলাকা) কলেরার ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি এলাকা থেকে শুরু করে টিকা দেওয়ার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেয় সরকার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ আগস্ট শুরু হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওরাল প্রাক-টিকাদান অভিযান চলে। প্রথম পর্বে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৮ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪০ জন। এর মধ্যে ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপ গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এবং এটি আগামী ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।





