বাম্পার ফলনেও কৃষকের কপালে ভাঁজ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ২:৩০:০৬ অপরাহ্ন
হাওরজুড়ে চলছে বোরো ধান কাটা

এমজেএইচ জামিল: সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে চলছে বোরো ধান কাটার মহোৎসব| ব্যস্ত সময় পার করছেন হাওরপাড়ের মানুষ| পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিশুরাও মেতে উঠেছে ˆবশাখী আমেজে| এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলনেও কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ| হাওরাঞ্চল জুড়ে ত্রিমুখী সংকটে শঙ্কিত কৃষক| ভয়কে জয় করে শেষ পর্যন্ত কষ্টের সোনালী ফসল গোলায় তুলতে হাওরপাড়ের মানুষের চেষ্টার অন্ত নেই| তবুও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শেষ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ বোরো ধান দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল আনবে বলে হাওরপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা|
কৃষি সম্প্রসারণের তথ্যমতে, জেলায় ৭ শতাধিক ক¤^াইন্ড হারভেস্টর সক্রিয়ভাবে কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে জ্বালানী সংকটের কারণে বন্ধ পড়ে আছে অর্ধেকের বেশী হারভেস্টর| চাহিদামতো ডিজেল কিনতে গিয়ে ভোগান্তির কারণে অনেকেই হারভেস্টর চালানো থেকে বিরত রয়েছেন| চলতি বোরো মওসুমে হাওরাঞ্চলে চাহিদামতো জ্বালানী সরবরাহের দাবী কৃষকদের|
জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন হাওরে চলছে বোরো ধান কাটা| তবে চাহিদার তুলনায় ধান কাটার ক¤^াইন্ড হারভেস্টার মেশিন ও শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটায় হিমশিম খাচ্ছেন বড় কৃষকরা, আর শ্রমিক সংকটের কারণে যাদেরই পাওয়া যাচ্ছে তাদের অতিরিক্ত মজুরি দিতে হচ্ছে|
একদিকে সময়মতো ফসল রক্ষা বাঁধ শেষ না হওয়ায় বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ফসল ডুবে যাওয়া নিয়ে শঙ্কিত কৃষক| অপরদিকে অতিবৃষ্টির কারণে হাওরজুড়ে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে হাজার হাজার হেক্টর জমি| বেশী পানিতে হারভেস্টর ধান কাটতে না পারায় অতিরিক্ত মজুরী দিয়ে শ্রমিক দিয়ে কাটাতে হচ্ছে ধান| ফলে বাড়ছে উৎপাদন খরচ|
বাজারে জ্বালানী সংকটের কারণে হারভেস্টর দিয়ে ধান কাটা নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই| একদিকে চাহিদামতো মিলছেনা হারভেস্টর, অপরদিকে চাহিদার বিপরীতে ধান কাটার শ্রমিক না আসায় পাকা ধানও সময়মতো তুলতে পারছেন না অনেক কৃষক| ডিজেলের সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে হারভেস্টরগুলো| কৃষি অফিস থেকে ধান কাটার নির্ধারিত মুল্য নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন নেই| ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ে বোরো ধান তুলতে হচ্ছে কৃষকদেরকে| এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে|
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আগাম বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের পানি থেকে ফসল রক্ষা করতে প্রতিবছর সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে| তবে এবছর অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধের কারণে, পাহাড়ি ঢল নয়, বৃষ্টিপাতের পানি হাওরের ভেতর আটকে তলিয়ে গেছে অনেক কৃষকের ¯^প্নের ফসল| এই ফসল বাঁচাতে কৃষকরা নিজেরাই বাঁধ কেটে পানি অপসারণের চেষ্টা করছেন| এতে বাড়ছে ঝুঁকি| কারণ বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল আসলে কেটে দেয়া বাঁধগুলো রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে| হুমকীর মুখে পড়বে কৃষকের সোনালী ধান|
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার সুনামগঞ্জে আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান| ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন| যার বাজারমূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা| তবে সেই ধান ঘরে তুলতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরের প্রায় ১০ লাখ কৃষক| আগাম বৃষ্টিপাতে ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমির ধান জলাবদ্ধতায় তলিয়েছে| এর মধ্যে প্রথম ধাপে বৃষ্টিপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২১ হেক্টর এবং দ্বিতীয় ধাপে বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ২১০ হেক্টর ধান| এই দুই ধাপে মোট ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৩৩১ হেক্টর জমির বোরো ধান| জেলার সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, শাল্লা, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলার নিচু জমিতে এখনো পানি জমে আছে| অনেক ক্ষেত্রেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানির মধ্যে ধান দাঁড়িয়ে রয়েছে| এতে করে ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে|
কৃষকরা আরও জানান, এবারও স্থানীয় শ্রমিক আর হারভেস্টার মেশিনেই কাটা হচ্ছে ধান| হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটলে কৃষকদের যেমন সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও আছে| একদিকে যেমন গো-খাদ্য হিসেবে খড় পান না, তেমনি জমিতে সামান্য পানি হলেও সেই মেশিন আর পানিতে নামানো যায় না| এমন পরিস্থিতিতে গভীর হাওরে নেওয়া যায় না হারভেস্টার মেশিন| এ জন্য নাইয়ার (শ্রমিক) এর দরকার|
কৃষি অফিস জানিয়েছে, জমিতে ৮ইঞ্চি পানি থাকলেও হারভেস্টার মেশিন ভালো করে কাজ করতে পারে| মূলত, কৃষকরা সনাতনী পদ্ধতি অর্থাৎ শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে বেশি আগ্রহী| এতে গবাদি পশুর খাদ্য উপযোগী খড় পাওয়া যায়|
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটতে প্রতি কেদার ৩০ শতক জমিতে ১৯০০ টাকা নেওয়ার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন| তবে বাস্তবে কৃষকদের মুখে শোনা যাচ্ছে ভিন্ন কথা| তারা বলছেন, এখন ˆবশ্বিক পরিস্থিতি ভালো নয়| তেল সংকটের পাশাপাশি হারভেস্টার মেশিন চালাতে প্রতিদিন অনেক তেল লাগে| তেলের দাম বৃদ্ধি ও তেল সংকটের কারণে কোনো অবস্থাতেই ১৯০০ টাকায় ধান কাটা সম্ভব নয়| অনেক জায়গায় প্রতি কেদারে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা নেয়া হচ্ছে| তবুও কেউ প্রশাসনে অভিযোগ দিতে আগ্রহী নয়| কারণ সকলের লক্ষ্যে আগে ধান তোলা| এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষক|
ছাতক উপজেলার বড়কাপন গ্রামের কৃষক আফসার উদ্দিন জানান, এবার দেখারহাওরে হাইব্রিড ও উন্নত জাতের ধান প্রতি ত্রিশ শতাংশ জমিতে ২০-২৫ মণ পর্যন্ত ফলন হচ্ছে| আর দেশি আগাম জাতের ধান ১০-১২ মণ হচ্ছে| যদি আবহাওয়া ভালো থাকে, তাহলে ক্ষতির পরও মোট ফলন সন্তোষজনক হবে| তবে এবার বড় দুশ্চিন্তা শ্রমিক সংকট ও যান্ত্রিক সহায়তা নিয়ে| এবার চাহিদামতো ধানকাটার শ্রমিক আসেনি| আর জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার দিয়েও কাটা যাচ্ছেনা| স্থানীয় ধানকাটার শ্রমিকগণ ধান কাটতে অতিরিক্ত মজুরী দাবি করছেন| সবমিলিয়ে এবছর ভালো ফলনেও ¯^স্তি পাচ্ছিনা| এমন মন্তব্য শুধু ছাতক উপজেলার আফসার উদ্দিনের নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের|
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, এবার ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০৩ কিলোমিটার অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে| হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রতিটি উপজেলায় কমিটি করে দেওয়া হয়েছে| ওই কমিটি প্রয়োজনে বাঁধ কেটে পানি অপসারণ করছে| আগামী বছর থেকে হাওর থেকে পানি অপসারণের জন্য যে জায়গায় স্লুইচ গেইট প্রয়োজন সেখানে তা নির্মাণ করা হবে, যাতে করে বৃষ্টির পানি অপসারণ হতে পারে|
তবে মাঠপর্যায়ে অনেক কৃষকই বাঁধের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন| তাদের অভিযোগ, কিছু স্থানে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দেওয়ার কারণেই পানি ¯^াভাবিকভাবে বের হতে পারছে না, ফলে জলাবদ্ধতায় ডুবেছে কৃষকের ফসল|
এ পরিস্থিতিতে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা ব্যবস্থাপনার ত্রুটিকে দায়ী করছেন| হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, এবারের ˆবশাখে আনন্দের পরিবর্তে সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে বিরাজ করছে গভীর আতঙ্ক| অব্যবস্থাপনা এবং যত্রতত্র অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে হাওরের ¯^াভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে| এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে কৃষকদের জীবনে, ফলে উৎসব উদযাপনের মতো পরিস্থিতি এখন আর তাদের নেই|
তিনি আরও বলেন, কৃষকরা এখন সবচেয়ে বড় যে শঙ্কায় রয়েছেন, তা হলো ˆবশাখের শেষ সময়ের মধ্যে তারা তাদের কষ্টার্জিত ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না| এই অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগের মধ্যেই হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দিন কাটছে, যা এবারের নববর্ষের আনন্দকে ম্লান করেছে|
তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে| তারমধ্যে ˆবশাখের প্রথম সপ্তাহে জেলার প্রায় সবকটি হাওরে ইতোমধ্যে ধান কাটা শুরু হয়েছে|
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, জেলায় ১৩৭টি হাওরে ইতোমধ্যে ধান কাটা শুরু হয়েছে| হাওরে ধান কাটতে ৭০৫টি হারভেস্টর দিনরাত কাজ করছে| এরমধ্যে ৫৭৭টি হারভেস্টর পুরোপুরি সচল রয়েছে এবং ১২৮টি হারভেস্টর মেরামত করা হয়েছে| সবগুলো হারভেস্টর ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছে|
তিনি বলেন, এবার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর| ইতোমধ্যে সব উপজেলায় ধান কাটা শুরু হয়েছে| আগামী সপ্তাহে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে| এবছর আগাম বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা কিছুটা পিছিয়েছে| তবে আবহাওয়া ভালো থাকলে মে মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে শতভাগ ধান কাটা শেষ হবে|




