হাওরে ধান কাটায় দুর্ভোগের শেষ নেই
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮:৫৬:২১ অপরাহ্ন
সংবাদদাতা: ডিজেল সংকট, কাদামাটির রাস্তার দুর্ভোগসহ নানা সংকটের মধ্যদিয়ে সময় পার করছেন হাওরপারের কৃষকরা। বিশেষ করে ডিজেল সংকটের কারণে হাওরের পাকা ধান কাটতে কৃষকদের পড়তে হচ্ছে নানা জটিলতায়। একই পরিস্থিতি তাহিরপুরের হারভেস্টার মালিকদের।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, হাওরে ধান কাটার জন্য উপজেলায় ৬৮টি হারভেস্টার মেশিন রয়েছে। এ বছর উপজেলার শনির, মাটিয়ান, আঙ্গারুলি, মহালিয়া ও বর্ধিত গুরমার হাওরে ১৭ হাজার ৮৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট হাওরগুলোর স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, তাহিরপুর উপজেলায় সর্বমোট ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে চলতি বছর বোরো ধান চাষাবাদ হয়েছে। মোট ধান চাষাবাদের হিসাব কৃষি অফিসের হিসাবে উল্লেখ করা হয়নি।
জানা যায়, ৫ এপ্রিল উপজেলা কৃষি অফিসের আয়োজনে হারভেস্টার মালিকদের নিয়ে ধান কাটার বিষয়ে উপজেলায় একটি সভা করা হয়েছে। সভায় উপস্থিত হারভেস্টার মালিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে ডিজেলের কোনো সংকট নেই। নির্ধারিত রেটে তারা যেন হাওরে কৃষকদের ধান কাটায় সহায়তা দেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। হাওরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ধান কাটায় হারভেস্টার ঠিক মতো সেবা দিতে পারছে না। ডিজেল আনতে গেলে অধিকাংশ সময় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে মালিকদের।
মাটিয়ান হাওরপারের বড়দল গ্রামের কৃষক ও হারভেস্টার মালিক মুছিহুর রহমান মিলন জানান, ৫ এপ্রিল কৃষি অফিস থেকে কর্মকর্তারা বলে দিয়েছিলেন ডিজেলের কোনো সংকট নেই। বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখছেন। ডিলারদের কাছে ডিজেল কেনার জন্য কৃষি অফিস থেকে একটি টোকেন দেওয়া হয়। সেই টোকেন পেতে হলে এনআইডি কার্ড ও হারভেস্টারের কাগজপত্রে কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নিতে হচ্ছে। স্বাক্ষর নিতে গিয়ে হারভেস্টার মালিকদের লাইনে দাঁড়াতে হয়। এভাবে দিন পার হয়ে যায় টোকেনে স্বাক্ষর পেতে। পরে সেই টোকেন নিয়ে কোনো রকম ডিলারের দোকানে পৌঁছতে পারলে ডিলার বলে দেয় আজ ডিজেল শেষ হয়ে গেছে। তারপর ডিজেল না নিয়ে খালি ট্যাঙ্কি হাতে ফিরতে হয়।
এ অবস্থায় তারা বাধ্য হয়েই ডাম্পের বাজার, শ্রীপুর বাজার ও তাহিরপুর বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া দামে ডিজেল কিনে হাওরে কৃষকদের ধান কাটছেন। এতে করে নির্ধারিত মূল্যে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।
আবার অনেক হারভেষ্টার মালিক কৃষকদের বলে দিচ্ছেন তারা ডিজেল এনে দিলে ডিজেলের দাম বাদ দিয়ে বাকি টাকায় ধান কেটে দেওয়া হবে। তারা প্রতি লিটার ডিজেল বিভিন্ন হাট থেকে ১৫০ টাকা দরে কিনেছেন।
শনির হাওরপারের হারভেস্টার মালিক উজান তাহিরপুর গ্রামের কৃষক নাহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি বিগত বছরে পাম্প থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০.১০ টাকা দরে কিনেছেন। বর্তমানে তিনি ডিলারদের কাছ থেকে ন্যূনতম প্রতি লিটার ডিজেল কিনছেন ১১০ টাকা করে। তবে এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম এক দফা বাড়ানো হয়েছে।
ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক দুটি হারভেস্টারের মালিক আতিকুর রহমান জানান, তিনি অনেক আগে থেকেই ডিজেল সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। শনির হাওরে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হয়েছে। শনির হাওরের কৃষকদের ধান কাটতে কোনো সমস্যা হবে না। এ পর্যন্ত শনির হাওরের ২০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে বলে তিনি জানান।
মহালিয়া হাওরপারের সুলেমানপুর গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, হারভেস্টার মালিকরা এ বছর প্রতি কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) দুই হাজার টাকা দরে ধান কাটছেন। গত বছর এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা নিয়েছিলেন। ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই অধিক মূল্যে ধান কাটাচ্ছেন। তবে হাওরে যে হারভেস্টারগুলো আছে তা একদিন ধান কাটলে দুদিন বিকল থাকে।
ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক এবাদুল ইসলাম বলেন, হাওরে এ বছর দুর্ভোগের শেষ নেই। টানা বৃষ্টিপাতের কারণে রাস্তায় কাদাপানি জমে রয়েছে। ডিজেল সংকট তো আছেই।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, হারভেস্টার মালিকরা যেন ডিজেল পেতে হয়রানির শিকার না হন, সে লক্ষ্যে মালিকদের এনআইডি কার্ড ও হারভেস্টার মেশিনের কাগজপত্র অফিসে নিয়ে এলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দিয়ে দিচ্ছেন।





