চালু হবে কি হরিপুর তেল ক্ষেত্র ?
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ মে ২০২৬, ১১:৩০:১৭ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আমদানি কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে দেশে তেল-গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে| তাই এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল নিয়ে টেকসই সমাধানের পথ খুঁজছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা| প্রশ্ন উঠেছে, অজানা কারণে উত্তোলন বন্ধ হওয়া সিলেটের হরিপুর তেল ক্ষেত্র কি চালু হবে? উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও হরিপুরের তেল নিয়ে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পেট্রোবাংলা| পেট্রোবাংলার এমন উদাসীনতাকে রহস্যজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা|
তথ্য বলছে, দেশের প্রথম তেল ক্ষেত্রটি আবিষ্কার হয় ১৯৮৬ সালে সিলেটের হরিপুরে| পরের বছরই এ ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে তেল উত্তোলন শুরু করে পেট্রোবাংলা| টানা সাত বছর তেল ক্ষেত্রটি থেকে ৫ লাখ ৪২ হাজার ব্যারেলের মতো তেল (ক্রুড অয়েল) উত্তোলন করা হয়| একপর্যায়ে উৎপাদন কমতে কমতে ১৯৯৪ সালে উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়|
যদিও তেল ক্ষেত্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হওয়ার কথা বলা হয়| কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঠিক কী কারণে হরিপুরে (সিলেট-৭) তেল উত্তোলন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা এখনো অজানা বলে মনে করেন ভূতত্ত্ববিদ এবং পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কাজ করা অনেক সাবেক কর্মকর্তা| হরিপুর তেল ক্ষেত্রে উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে কারিগরি সমস্যা, ওয়েলহেড প্রেসার কমে যাওয়া এবং অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন ভূতত্ত্ববিদরা| আর পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের দাবি, কূপে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক উৎপাদন লাভজনক থাকেনি|
অন্যদিকে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও হরিপুরে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরনো ও পরিত্যক্ত কূপ থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার ও উত্তোলন করা হচ্ছে| জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদিও অজানা কারণে হরিপুরে তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়নি|
সিলেটের হরিপুর স্ট্রাকচারে সিলেট-১০ কূপ খনন করে ২০২৩ সালের ডিসে¤^রে তেল পাওয়ার কথা জানায় পেট্রোবাংলা| ওই সময় জানানো হয় সিলেট গ্যাস ক্ষেত্রের নতুন কূপে ১ হাজার ৩৯৭ থেকে ১ হাজার ৪৪৫ মিটার গভীরতায় তেলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে| প্রাথমিকভাবে ˆদনিক ৩৫ ব্যারেল করে তেলের প্রবাহের কথাও জানিয়েছিলেন তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী| হরিপুরের পর এটিই বাংলাদেশের দ্বিতীয় ¯^ীকৃত তেল ক্ষেত্র|
এ আবিষ্কারের প্রায় আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সিলেট-১০ কূপ থেকে তেল উত্তোলনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি পেট্রোবাংলা| যদিও পেট্রোবাংলা বলছে, সিলেট-১০ কূপ থেকে তেল উত্তোলনের জন্য কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে| জমিসংক্রান্ত জটিলতা শেষ হলেই পাইপলাইনের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে|
পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, হরিপুরের তেল ক্ষেত্রে প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী মোট এক কোটি ব্যারেল (১০ মিলিয়ন) তেলের সম্ভাব্য মজুদ পাওয়া যায়| কিন্তু সেখান থেকে ৭ বছরে মাত্র ৫ লাখ ব্যারেল ক্রুড অয়েল উত্তোলন করা হয়| সেই হিসেবে এখনো অন্তত ৯৫ শতাংশ তেল সেখানে জমা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে|
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) তথ্য অনুযায়ী, সে সময় হরিপুর তেল ক্ষেত্র থেকে ˆদনিক ৩০০-৪০০ ব্যারেল পর্যন্ত ক্রুড অয়েল উত্তোলন করা হয়েছে| যদিও পরবর্তী সময়ে তা ১০০ ব্যারেলে নেমে আসায় একপর্যায়ে কূপটি থেকে তেলের উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়|
বর্তমানে পেট্রোবাংলা ৫০ কূপ খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে| ২০২৮ সালের মধ্যে আরো ১০০ কূপ খনন (নতুন কূপ, ওয়ার্কওভার ও উন্নয়ন কূপ) উদ্যোগ নিয়েছে| তবে গ্যাস কূপের মধ্যে হরিপুরের পরিত্যক্ত তেল কূপের বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেই| বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে জোরালো অনুসন্ধান চালানোর বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে| সেক্ষেত্রে জ্বালানি বিভাগ তথা পেট্রোবাংলা হরিপুরের তেল ক্ষেত্রটি নতুন করে উন্নয়ন করবে কিনা সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানা যায়নি|
হরিপুর তেল ক্ষেত্রে উত্তোলন অব্যাহত রাখার জন্য ˆবশ্বিক যেসব পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার ছিল সেগুলো নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন ভূতত্ত্ববিদ| বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, হরিপুর তেল ক্ষেত্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তেল ফুরিয়ে যাওয়া, পাইপলাইনে মোমজাতীয় রাসায়নিক পদার্থ জমা হওয়া ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ের কথা বলা হয়| তবে কোনো কূপ পরিত্যক্ত ঘোষণার আগে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এমনকি কী কারণে সেটি বন্ধ করা হচ্ছে সে বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন থাকে| আমার জানা মতে হরিপুর তেল ক্ষেত্রের বিষয়ে এ রকম কোনো প্রতিবেদন দেয়া হয়নি|
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, হরিপুর থেকে গ্যাস ও কনডেনসেট পাওয়া যাচ্ছে| আমাদের দেশে এক্সপ্লোরেশনের একটা দিক হলো যদি কোনো একটা কূপে পাঁচটা লেয়ারে খনন করা হয়, আর সেখানকার একটা লেয়ারে কমার্শিয়ালি গ্যাস উত্তোলন করার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তাহলে বাকি চারটি লেয়ারের সম্ভাবনাগুলো নিয়ে আর কাজ করা হয় না| তিনি বলেন, এখন যেহেতু গ্যাস নেই, আমদানি করা হচ্ছে, ফলে যেসব সম্ভাবনাময় লেয়ার চিহ্নিত করা হয়েছে, এখন সেখানে খনন করা হচ্ছে, আর গ্যাসও মিলছে| হরিপুর তেল ক্ষেত্রের যেসব লেয়ারে অনুসন্ধান করার সুযোগ ছিল, ড্রিলিং করা প্রয়োজন ছিল, সেটা হয়নি| গ্যাস-তেল অনুসন্ধানে সুদূরপ্রসারী চিন্তা দরকার| সবসময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকলে আর অর্থনৈতিক লাভ-লোকসানের হিসাব করলে অনুসন্ধানে জোর দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না|
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, হরিপুর স্ট্রাকচারে সিলেট-১২ নামে একটি কূপ খনন করার উদ্যোগ নিয়েছে এসজিএফএল| এ কূপ খনন করে তেলের উপস্থিতি পাওয়া গেলে তার ওপর ভিত্তি করে হরিপুর তেল ক্ষেত্র বা সিলেট-৭ কূপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে|
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, হরিপুর তেল ক্ষেত্র থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে| যদি কখনো গ্যাসের উপস্থিতি কমে যায়, তাহলে নতুন সার্ভেতে হয়তো সেখানে তেল-গ্যাসের বিষয়ে পুনরায় অনুসন্ধান করা যেতে পারে|




