নানামুখী সংকটে ঈদে পর্যটক খরার শঙ্কা
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ মে ২০২৬, ১২:৪২:৫১ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক: পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে দেশের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র শ্রীমঙ্গল আবারও পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত। পাহাড়, টিলা, চা-বাগান আর হাওরের অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই জনপদে প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নামার প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। তবে ঘন ঘন ঝড়-বৃষ্টি, দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব, ট্রেনের টিকিট সংকট ও সড়কপথের যানজটকে ঘিরে এবার ঈদ পর্যটন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ।
প্রকৃতির লীলাভূমি চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সবুজে মোড়ানো চা-বাগান, ঝর্ণা, টিলা ও হাওরের অপরূপ সৌন্দর্যে পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সারি সারি চা-বাগান ছাড়াও দার্জিলিং টিলা, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), টি মিউজিয়াম, বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, হাইল হাওর, বাইক্কা বিল মৎস্য অভয়াশ্রম, নীলকণ্ঠ সাত রঙের চা কেবিন, চা-কন্যা ভাস্কর্য, বধ্যভূমি-৭১, লাল পাহাড়, শঙ্কর টিলা, গরম টিলা, ভাড়াউড়া লেক, ডিনস্টন ওয়ার সিমেট্রি, হরিণছড়া গলফ মাঠ এবং বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর পল্লি পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক ও নূরজাহান চা-বাগান,হামহাম জলপ্রপাত, পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য। ছোট-বড় মিলিয়ে এ অঞ্চলে রয়েছে অর্ধশতাধিক দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন স্পট। প্রতি বছর ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে লাখো পর্যটকের সমাগম ঘটে এখানে।
ঈদকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে চা-বাগান ও পাহাড়ঘেরা এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন রিসোর্ট, ইকো কটেজ, গেস্ট হাউস ও হোটেল নতুন সাজে সেজে উঠেছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বাড়ানো হয়েছে খাবারের বৈচিত্র্য। শিশু ও পরিবারভিত্তিক বিনোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে প্রস্তুতির মধ্যেও বিরূপ আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, বড় বড় রিসোর্ট ও গেস্ট হাউসের তুলনায় পাহাড় ও চা-বাগানঘেরা ছোট ছোট ইকো কটেজ গুলোতে ইতোমধ্যে তুলনামূলক ভালো বুকিং হয়েছে। তবে অধিকাংশ বড় রিসোর্ট এখনো পুরোপুরি বুকিং না পাওয়ায় কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মালিকরা। তাদের আশা, টানা এক সপ্তাহের ছুটিতে ঈদের পরবর্তী দিনগুলোতে বুকিং বাড়বে।
এদিকে পর্যটকদের জন্য গড়ে ওঠা শতাধিক হোটেল ও রিসোর্টে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে রিসোর্টগুলো।
উপজেলার নভেম ইকো রিসোর্টের হিসাবরক্ষণ বিভাগের ব্যবস্থাপক অংকুর দত্ত বলেন, শ্রীমঙ্গলে ঈদের আগাম বুকিং আমরা অনেক কম পাচ্ছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় পর্যটকরা কম আসতে চাচ্ছেন। অনেকেই আগাম বুকিং দিয়ে পরে বাতিল করেছেন। এখন ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। গেস্ট কম থাকলেও আমরা জেনারেটর চালিয়ে সুবিধা দিচ্ছি। এতে আমাদের বাড়তি খরচ হচ্ছে। ঈদের ছুটিতে বেশি পর্যটক এলে সেটি পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আশানুরূপ বুকিং হয়নি।
বালিশিরা রিসোর্টের ম্যানেজার ইয়াছির আরাফাত স্বপন বলেন, সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেকেই আগাম বুকিং বাতিল করছেন। নতুন করেও বুকিং আসছে। তবে অন্যান্য বছরের মতো পর্যটক আসবে না মনে হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল ট্যুর অপারেটর অ্যান্ড ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রমজানের ঈদে অনেক বিদেশি পর্যটক বুকিং বাতিল করেছিলেন। এরপর থেকে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এবার ঈদুল আজহায় দীর্ঘ ছুটি থাকলেও বিদেশি পর্যটক তেমন পাওয়া যায়নি। আমি অন্যান্য ট্যুর গাইডদের সঙ্গেও কথা বলে জেনেছি, বেশিরভাগই এখনো দেশি বা বিদেশি পর্যটক এর বুকিং পাননি।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, রমজানের ঈদে জ্বালানি সংকটের কারণে আশানুরূপ পর্যটক পাইনি। এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষেও হোটেল-রিসোর্টে আগাম বুকিং কম। এর পেছনে সারাদেশে হামে মৃত্যুর ঘটনা, ঘন ঘন ঝড়-বৃষ্টি, ট্রেনের টিকিট সংকট এবং সড়কপথের দীর্ঘ যানজট বড় কারণ। বিভিন্ন হোটেল-রিসোর্টে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, শহরের হোটেল গুলোতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং শহরের বাইরের রিসোর্টগুলোতে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আগাম বুকিং হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি ছোট রিসোর্ট ইতোমধ্যে হাউসফুল বুকিং পেয়েছে। তারপরও আমরা আশাবাদী, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়বে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা ইতিমধ্যে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। ঈদে আসা পর্যটকরা যেন নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে ঘুরে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেজন্য বিভিন্ন পর্যটন স্পট, হোটেল ও রিসোর্ট এলাকায় পুলিশের একাধিক টিম দায়িত্ব পালন করবে।




