আবারও রডের বদলে বাঁশ!
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:১০:৫৭ অপরাহ্ন
সম্প্রতি ‘ব্রিজ নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে| এতে বলা হয়েছে, বরিশালের আগৈলঝড়া উপজেলায় ব্রিজ নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি ও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে| এ ঘটনার সত্যতা প্রমাণ পাওয়ায় ব্রিজটির একটি অংশ ভেঙ্গে দিয়ে উপজেলা প্রশাসন|
বলা বাহুল্য, সড়ক, সেতু, দেয়াল বিল্ডিং ও অন্যান্য স্থাপনায় রডের পরিবর্তে বাঁশ ও বাঁশের কঞ্চি ব্যবহারের বহু ঘটনা ইতোপূর্বে ঘটেছে| তফাৎ হচ্ছে, ˆ¯^রাচারী হাসিনার শাসনামলে এ ধরনের অভিযোগ ওঠলেও এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হতো না| কোন কোন ক্ষেত্রে জনগণের চাপের মুখে আইওয়াশধর্মী কিছু পদক্ষেপ নেয়া হতো, পার পেয়ে যেতো দুর্নীতিবাজ চক্র| ˆ¯^রাচারী হাসিনার আমলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুল ভবন নির্মাণেও রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার বহু ঘটনা ঘটে| বিষয়টি কতোটা গর্হিত অপরাধ ও বিপজ্জনক তা বলাই বাহুল্য| ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী ‘রডের বদলে বাঁশ দিয়েও শাস্তি নামমাত্র’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়| এতে বলা হয়, সারা দেশে সরকারী ভবন ˆতরীসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ কাজে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনা একের পর এক ফাঁস হতে থাকায় পূর্ত কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে| ভবন ও স্থাপনাগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে ˆতরী হয়েছে, সংশয়| এছাড়া রেলসেতুতে স্লিপার রক্ষায় বাঁশ ব্যবহারের প্রথম ঘটনাটি নজরে আসে ২০১৬ সালের ডিসে¤^র মাসের শেষে|
মিডিয়ায় প্রতিবেদন অনুসারে, সিলেট-আখাউড়া রেলপথের মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা ২০৬ ন¤^র মনু রেলসেতুর শতাধিক নষ্ট স্লিপার স্থানচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে ফালি করা বাঁশ বসিয়ে পেরেক টুকে রাখা হয়| খবর প্রকাশের পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মনু রেলসেতু থেকে বাঁশের ফালি অপসারণ করলেও এ ব্যাপারে কারো কারো বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি| বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ| এছাড়া ‘কালভার্টে রডের বদলে বাঁশ’ ‘স্কুলের শৌচাগার নির্মাণে রডের বদলে বাঁশ’ ইত্যাদি শিরোনামে এ পর্যন্ত বহু নিউজ প্রকাশিত হয়েছে মিডিয়ায়|
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অন্যায় ও অপকর্মের অনেক সমস্যা ও বিপদ রয়েছে| যেমন, বাঁশ লোহার মতো ভার নিতে পারে না| ফলে ভবন বা সেতু খুব দ্রুত ভেঙ্গে পড়ে এবং মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে| লোহা পানিতে ও রোদে দীর্ঘস্থায়ী হয়| অন্যদিকে বাঁশ পচে যায়, ঘুনে ধরে| কংক্রিট বা সিমেন্ট চাপ নিতে পারে| কিন্তু টান টান ভাব নিতে পারে না| লোহা বা রড এই টান সহ্য করে স্থাপনাকে শক্ত রাখে| সর্বোচ্চ সঠিক নির্মাণ কাজের জন্য বিশেষজ্ঞরা অনুমোদিত নকশা এবং ভালো মানের সামগ্রী ব্যবহার বাধ্যতামূলক বলে মনে করেন|
বাংলাদেশে নির্মাণ খাতের দুর্নীতি একটি অন্যতম বড় সমস্যা| টেন্ডার বা কাজ পাওয়ার সময় ঘুষ দেওয়া, নিম্নমানের জিনিস ব্যবহার করা এবং সরকারের টাকা মেরে খাওয়ার মতো ঘটনা এখানে হরহামেশা ঘটছে| এর ফলে রাস্তাঘাট, ভবন বা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে| বিভিন্ন বড় প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি হয়| টিআইবি’র তথ্যমতে, গত ১৫ বছরে শুধু সড়ক ও জনপথ বিভাগেই বিশাল অংকের টাকার দুর্নীতি বা আত্মসাৎ হয়েছে| স্থানীয় পর্যায়ে রাস্তা, কালভার্ট বা স্কুল কলেজ নির্মাণের ছোট কাজেও ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারদের যোগসাজশে দুর্নীতি হতে দেখা যায়| প্রায় অর্ধ যুগ আগে একটি জাতীয় মিডিয়ায় এলজিইডি’র ৫৩ শতাংশ সড়কই খারাপ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়| এতে বলা হয়, কয়েক বছর ধরে বাজেটে সড়ক যোগাযোগ খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে আসছে সরকার| এটি থেকে প্রতীয়মান হয়, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে| কিন্তু একাধিক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দেশে আন্তর্জাতিক মানের কোন সড়ক-মহাসড়কই নেই| অথচ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো, মানসম্পন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা| মূলত: নিম্নমানের কাজ ও নির্মাণ উপকরণ, অনিয়ম দুর্নীতি ও অদক্ষ ঠিকাদার, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নকশার ত্রুটি ও অপ্রতুল বরাদ্দ সড়ক নেটওয়ার্ককে ভঙ্গুর দশায় নিয়ে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করছেন|
সর্বোপরি, এ পর্যন্ত দুর্নীতির কারণে যে সড়ক, সেতু, ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণভাবে ˆতরী হয়েছে, এর সবগুলোই স্থায়িত্বহীন, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ| এগুলো চিহ্নিত করে অবিল¤ে^ অপসারণ বা ভেঙ্গে ফেলা জরুরী| জানমালের নিরাপত্তার জন্যই তা দরকার| আমরা এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সকলের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করছি|




