তুরাবকে নিয়ে যত সুখ দুঃখের স্মৃতি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১:০০:২৫ অপরাহ্ন
মো. ফয়ছল আলম:

প্রিয় সহকর্মী এটিএম তুরাবকে হারানোর দুই বছর। চব্বিশের ১৯ জুলাই এক কঠিন সংগ্রামের মুহূর্তে আমাদের সকল সহকর্মী আর প্রিয়জনদের কাঁদিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছে। তুরাবকে নিয়ে অনেকের অনেক স্মৃতি আছে। অনেক কথা আছে, কিন্তু আমার স্মৃতি, কথা আর বেদনাগুলো বারবার মনে পড়ে, চোখের জলে ভাসায়। কিছুতেই ভুলতে পারিনা তাঁকে। এর অনেক কারণ। গ্রামের মেঠো পথে হেঁেট চলে বেড়ে উঠা তুরাব ছিল বিয়ানীবাজারের এক পরিচিত মুখ। সেখানকার ধুলোমাটি মাড়িয়ে সাংবাদিকতায় যে আনন্দ পেতো। চ্যানেল এস, নয়া দিগন্তে , জালালাবাদের হয়ে কাজ করতো। সপ্তাহজুড়ে নামে একটি পত্রিকাও ছিল তাঁর পিতার। কিন্তু কেন যে তাঁেক কাছে টানতে গেলাম। যাকে তাঁর বাবা মায়ের কাছ থেকে বলে কয়ে এই ইটপাথরের শহরের সাংবাদিকতায় যুক্ত করলাম। আর শেষমেষ জীবন দিয়ে এ পেশার প্রতি তার দায়িত্ববোধের প্রমাণ দিয়ে গেলো। আর এক বুক যন্ত্রণা রেখে গেলো আমার জন্য। অনুশোচনায় দ্বগ্ধ হই ক্ষণে ক্ষণে। এ যাতনার যেন শেষ নেই।
প্রায় ২০ বছর আগের কথা। আমি তখন দৈনিক জালালাবাদের টেবিলে কাজ করি। সালটা পুরো মনে নেই। সাংবাদিক এটিএম তুরাব তখন জালালাবাদের বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি। সেই থেকে তুরাবের সঙ্গে পরিচয়। বিয়ানীবাজারের খবরগুলো সে-ই পাঠাতো। দেখতাম আমরা যারা টেবিলে কাজ করতাম তাকে মাঝে মধ্যে অফিসে আসতে। একজন জুনিয়র কর্মীর নানা আচার আচরণ আমাদের নজরে থাকে। তেমনি তুরাবের অনুসন্ধিৎসু মন, বিনয়ী ব্যবহার আর ভদ্রতা আমাকে মুগ্ধ করতো। এ কারণে আমি ছিলাম তার গুণমুগ্ধ। মনে পড়ে তুরাবের আব্বার কথা। তাঁর মরহুম পিতা মাস্টার আব্দুর রহিম ছিলেন একজন গুণী মানুষ। আমি গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজার সংবাদে প্রায় অর্ধশতাধিক গুণীজনকে নিয়ে প্রতিবেদন করেছি। বিয়ানীবাজারের জীবিত গুণী মানুষদের তালিকা করতেই মরহুম এ আজিজ, সৈয়দ আশরাফ হোসেন, আব্দুল হাকিম তাপাদার, মাষ্টার আব্দুর রহিম, আলী আহমদ স্যারদের নাম পাই। মাষ্টার আব্দুর রহিম ছিলেন এটিএম তুরাবের পিতা। বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের দীর্ঘকালীন সভাপতি। পিএইচজি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। একাধিক পরিচয় ছিল তাঁর। আমি তাঁকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করি। যার শিরোনাম ছিল ‘আব্দুর রহিম স্যার এখনও লিখেন, ভাবেন’। তুরাবকে যখন আমি সিলেক্ট করি তখন তাঁর উড়ো উড়ো মন। বয়স কম। এই রিপোর্টটি করার পর তুরাবকে আমি একদিন ডাকি। তাকে নিয়ে বসি। আলাপ করি। বোঝাই। তুমি এতবড় একজন গুণী মানুষের ছেলে। সাংবাদিকতা যেনতেন ভাবে করলে চলবেনা। বলি তোমাকে বাবার নাম রাখতে হবে। সেদিনের আলোচনার পর আমি তুরাবের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করি। সেই থেকে পেশাগত দিকে অধিক মনোনিবেশ করে। যে কোনো কাজ আরও গুরুত্ব সহকারে করতে থাকে। আর পেশাগত জীবনে সে তাঁর সাফল্যের ধারাকে এগিয়ে নিতে থাকে। ২০১০ সালে যখন সাপ্তাহিক গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার সংবাদ বের হয়। তখন কথা উঠে সবখানে না হলেও এই দুই উপজেলায় নিজস্ব প্রতিনিধি দরকার। তখন তুরাবের কথা মনে পড়ে। সিদ্ধান্ত নেই গোলাপগঞ্জে শহিদুর রহমান সুহেদ আর বিয়ানীবাজারে এটিএম তুরাবকে দায়িত্ব দেব। দুইজনের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। তারা দুজনেই সানন্দে সায় দিলেন। সেই থেকে তুরাবের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে।
২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তুরাব আমার সঙ্গে গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজার সংবাদ এর টিমে কাজ করেছে। এরই মাঝে তুরাব ২০১৭ সালে দৈনিক জালালাবাদে ফটোগ্রাফার হিসেবে যোগ দেয়। কিছুদিন পর দৈনিক জালালাবাদ কর্তৃপক্ষ তাকে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব দেন। সেই থেকে তুরাব ছবি তোলার পাশাপাশি রিপোর্টিংয়েও মনোনিবেশ করে। এখানেও তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে তুরাব। ক’বছরে সে দুটি পুরষ্কার আনে জালালাবাদ থেকে। ব্রাক মাইগ্রেশন রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড এবং নিউজ নেটওয়ার্কের অনুসন্ধানী রিপোর্টিং পুরষ্কার তাঁর জীবনে বড়ো স্বীকৃতি এনে দেয়। এরপর এই এটিএম তুরাব দেশের জাতীয় শীর্ষ দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পায়। অল্প সময়ে তৃণমুল থেকে উঠে আসা একজন তরুণ সাংবাদিকের এমন উত্থান সত্যিই এক অনন্য মেধার পরিচয় মিলে এটিএম তুরাবের সংক্ষিপ্ত জীবন থেকে। তুরাবের একের পর সাফল্যে কে খুশি, কে নাখোশ হতেন তা আমি জানতে চাইতাম না। আমার ভেতর সব সময় এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করতো। মনে মনে ভাবতাম পেশাগত জীবনে তুরাবকে সিলেকশন আমার ভুল ছিলনা।
২০২০ সালে তুরাব যখন ব্রাক মাইগ্রেশন এ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল তখন আমার মনে কি আনন্দ ছিল তা বুঝাতে পারবোনা।
পেশাগত জীবনে সে ভালো করতো আর আমি আনন্দ পেতাম। সিলেট প্রেসক্লাবের মেম্বারশীপের জন্য যে আবেদনপত্র সে করে সেখানে আমি স্বাক্ষর করেছিলাম। এভাবে তুরাবের জীবনের প্রতি বাঁকে বাঁকে আমি ছিলাম তার ছায়াসঙ্গী। এজন্য তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
শুধু আমার নয়, তুরাবের মৃত্যুতে সিলেটের সাংবাদিকতার অঙ্গনে বড়ো ক্ষতি হয়ে গেলো। তিল তিল করে পনের বছরে নিজেকে সে গড়েছিল। তার কাছ থেকে সমাজ রাষ্ট্র সিলেট উপকৃতই হয়েছে। সিলেটের সাংবাদিকতা সমৃদ্ধ হয়েছে। সাংবাদিকরা লিখে শুধু অন্যের জন্য। তুরাবের ভালো লেখনিগুলো জীবনের কথা বলবে যুগের পর যুগ। তুরাবের সঙ্গে অনেক স্মৃতি। অনেক কথা। লিখতে গেলে এই স্বল্প সময়ে সম্ভব না। তুরাবের সাংবাদিকতা, মানবিকতা নিয়ে লিখতে চাইলে অনেক লিখা যাবে। সেদিন যখন তুরাবের লাশ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছিলেন তখন এক ফটো সাংবাদিক আমাকে বললো-ভাই তুরাব অনেক বড় মনের মানুষ ছিল। আমার বিয়েতে কি উপহার দেবে তা বারবার জিজ্ঞেস করেছিল। পরে শেষ পর্যন্ত আমার জন্য বিয়েতে বরের গাড়ি উপহার দেয়। আজ খুব বেশি আফসোস হচ্ছে সেই বোনটির জন্য। মাত্র তিন মাস আগে যে তুরাবের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। নেপালে হানিমুন ট্যুরে গিয়েছিল। তুরাবের মা ভাই আর বোনদের কান্না দেখেছি। শান্তনা দেয়ার বৃথা চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাঁর সদ্য বিবাহিতা তরুণীকে স্ত্রীকে সান্ত্বÍনা দেবে কে?
তুরাবের মরদেহের পোস্ট মর্টেমের দিন সকালে যখন হাসপাতালে যাই তখন কথা হয় সেখানকার এক কর্মচারীর সঙ্গে। সে লাশ দেখে কেঁদে কেঁদে বের হচ্ছিলো। আমার সঙ্গেও তার পূর্ব পরিচয় ছিল। সে বলল, ভাই এই সাংবাদিক আমাকে মাঝে মাঝে বন্যা, করোনা, ঈদের সময় উপহারের প্যাকেট দিতেন। আমি খুব খুশি হতাম। আজ লাশ দেখেই আমি তাকে চিনতে পেরেছি। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। মনে মনে ভাবি আমিওতো অনেকের কাছ থেকে নিউজের সাহায্য নিয়েছি। ক’জনের প্রতি এমন খোঁজ নিয়েছি। তুরাব তুমিই উত্তম। তুমিই সফল। তোমার জীবনই সার্থক। আল্লাহ তোমাকে জান্নাতবাসী করুন।
লেখক: সহ সভাপতি, সিলেট প্রেসক্লাব।






