জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে ডেঙ্গুর চিত্র
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ জুলাই ২০২৬, ৭:২৭:৫৪ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক: বাংলাদেশে ডেঙ্গু আর শুধু বর্ষাকালের একটি মৌসুমি রোগ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে এডিস মশার বিস্তার আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এর ফলে রাজধানী ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের প্রায় সব বিভাগ, জেলাÑ এমনকি অনেক গ্রামাঞ্চলেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও দ্রুত বিস্তারমান জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির একটি হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়েই ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ভৌগোলিক বিস্তার এবং সংক্রমণের মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে নয়। ডব্লিউএইচওর মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্র পরিবেশ এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য আরও অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জলবায়ু-সহনশীল করার ওপরও জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন, আর্দ্রতা এবং মৌসুমি আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য। এসব পরিবর্তন এডিস মশার জীবনচক্রকে আরও অনুকূল করে তুলছে। ফলে আগে যেখানে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যেত, এখন প্রায় সারা বছরই বিচ্ছিন্নভাবে রোগী শনাক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশের গড় তাপমাত্রা এবং ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও কয়েকগুণ বেড়েছে। এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই ডেঙ্গু জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোগীর সংখ্যা শুধু বাড়ছেই না, মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে দেশ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু মৌসুমের মুখোমুখি হয়। এ বছর দেশে ৩ লাখের বেশি ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১ হাজার ৭০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু আবারও বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে দেখা দেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরজুড়ে মোট প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৫৬২ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত বা হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪১২ জনের মৃত্যু হয়। বছরের শেষ দিকে সংক্রমণ ও মৃত্যু দ্রুত বাড়ে; বিশেষ করে অক্টোবর ও নভেম্বর ছিল সবচেয়ে উদ্বেগজনক সময়। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, এই প্রবণতা কাকতালীয় নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এডিস মশার বিস্তার, ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা এবং মানুষের ঝুঁকিÑ সবই একসঙ্গে বেড়ে চলেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এডিস মশা সাধারণত ২৫ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে দ্রুত বংশবিস্তার করে। বাংলাদেশের বর্তমান আবহাওয়ায় বছরের বড় একটি সময় এই তাপমাত্রা বিরাজ করে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে সময় কম লাগে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু ভাইরাসও মশার শরীরে দ্রুত পরিপক্ব হয়। ফলে আক্রান্ত মশা অল্প সময়েই অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, কয়েক দশক আগেও শীত মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু বর্তমানে শীতকাল তুলনামূলক উষ্ণ হওয়ায় এডিস মশার উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এতে সংক্রমণের মৌসুমও দীর্ঘ হচ্ছে।
ডেঙ্গু বিস্তারের আরেকটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত। কখনও স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আবার কখনও দীর্ঘ বিরতির পর ভারী বর্ষণÑ এই পরিবর্তিত আবহাওয়া শহরজুড়ে অসংখ্য ছোট ছোট জলাধার তৈরি করছে। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদের ড্রাম, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, এসির ট্রে কিংবা ভাঙা বোতলে জমে থাকা পরিষ্কার পানি এডিস মশার আদর্শ প্রজননক্ষেত্র।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু শহরের ড্রেনেজব্যবস্থা সেই চাপ সামলাতে না পারায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। এতে এডিস মশার বিস্তার আরও দ্রুত হয়। একসময় ডেঙ্গুকে ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন সেই ধারণা পাল্টে গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বর্তমানে দেশের প্রায় সব বিভাগ থেকেই নিয়মিত ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হচ্ছে। সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন এডিস মশাকে নতুন এলাকায় বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের ভ্রমণ, নগরায়ণ এবং জনসংখ্যার ঘনত্বও সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
চিকিৎসকদের মতে, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ডেঙ্গুর জটিলতায় বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরই রোগী সংকটাপন্ন অবস্থায় চলে যান। তাই ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে এখন শুধুমাত্র মশক নিধনের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এটি জলবায়ু অভিযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের মতে, আবহাওয়ার তথ্য, বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস, তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং রোগের তথ্য সমন্বয় করে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় জলাবদ্ধতা কমানো, নির্মাণাধীন ভবনের নিয়মিত তদারকি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে।
জলবায়ু গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহের পাশাপাশি ডেঙ্গুর মতো বাহকবাহিত রোগের বিস্তারও জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বড় প্রভাব। তাদের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরও বাড়লে ডেঙ্গুর ঝুঁকি দেশের নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। তাই এখনই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু মৌসুমি অভিযান যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। তাদের মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ডেঙ্গু বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এটিকে আর সাধারণ মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর কর্মসূচি, নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস, ভেক্টর সার্ভেইল্যান্স এবং স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন করা এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিকে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।






