পে-স্কেল না যন্ত্রণা!
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৫:৫২ অপরাহ্ন
সরকারী চাকুরীজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো গতকাল থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে সরকারী আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় চলতি ও আগামী অর্থবছরে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন হবে। নতুন বেতন কাঠামো প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন এই বেতন কাঠামো আরো আগে হওয়া দরকার ছিলো। তবে এটার জন্য বেসরকারী খাতে এক ধরনের চাপ তৈরি হবে। মূল্যস্ফীতির চাপ আমলে নিয়ে বেসরকারী খাতের সবখানে, এমনকি সংবাদ মাধ্যমেও নতুন বেতন কাঠামো হওয়া দরকার। আবার সরকারী খাতে অপ্রয়োজনীয় লোকবল কমিয়েও আনা যেতে পারে। এতে সরকারের ব্যয় কমবে।
জানা গেছে, নতুন বেতন স্কেলে উচ্চ গ্রেডের চাকরীজীবীদের বেতন দ্বিগুণ হচ্ছে, তবে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা তার চেয়েও বেশী বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ সরাসরি এই বেতন বৃদ্ধির সুবিধার আওতায় আসবে।
সর্বোপরি নতুন স্কেলে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বেড়েছে প্রায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের ১০০ শতাংশ। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ হাজার কোটি টাকারও বেশী প্রয়োজন হবে। বেতন কাঠামো কার্যকরের তারিখ ১ জুলাই হওয়ায় জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বর্ধিত বেতনও একসঙ্গে পরিশোধ করতে হবে সরকারকে। সচেতন মহল মনে করেন, নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারী কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়লেও এর কিছু উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি ও বাজারের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। কিছু মানুষের হাতে একযোগে অতিরিক্ত টাকার নগদ প্রবাহ বাড়লে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। অসৎ ব্যবসায়ীরা পে স্কেলের অজুহাত দেখিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে পে-স্কেলের অর্থ পরিশোধের জন্য সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। এতে বাজেট ঘাটতি আরো বাড়বে। উন্নয়ন কাজে বিঘ্ন ঘটবে। নেমে যাবে সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান। এতে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে সিংহভাগ বেসরকারী পেশার জনগোষ্ঠী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারী চাকরীজীবীদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে এবং বেসরকারী খাতের কর্মীদের আয় সেভাবে না বাড়লে দুই খাতের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরী হয়। পে স্কেলের বাড়তি অর্থের যোগান দিতে যদি ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়, তবে পে স্কেলের বাইরে থাকা কোটি কোটি সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো আরো কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সরকারকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ দেন অর্থনীতিবিদরা। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও অভিযান জোরদার করতে হবে। পাইকারি ও খুচরো বাজারের মূল্যের ব্যবধান নির্দিষ্ট করতে ডিজিটাল প্রাইম ট্র্যাকিং চালু করতে হবে। টিসিবি’র মাধ্যমে ওএমএস কার্যক্রম বাড়িয়ে স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি দেশের সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও প্রকৃত মজুরী বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে।




