প্রধানমন্ত্রীর কঠোরতা, এমপির পদত্যাগ : রাজনীতির চেনা সংস্কৃতিতে নতুন বার্তা
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৩৮:৫৭ অপরাহ্ন
জালালাবাদ প্রতিবেদন : অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পদ আঁকড়ে রাখার চিরচেনা সংস্কৃতিতে এবার এলো বড় ধাক্কা। হামলা, লুটপাট এবং ভাঙচুরের তাণ্ডবে নাম আসতেই সংরক্ষিত এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ওপর থেকে আশীর্বাদের হাত তুলে নিলেন প্রধানমন্ত্রী। দলীয় প্রধানের নজিরবিহীন ‘হার্ডলাইন’ অবস্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন এই সংসদ সদস্য।
এমন ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত রাজনীতির চেনা আকাশে দীর্ঘদিনের গুমোট মেঘ সরিয়ে নতুন বাতাসের আগমন হিসেবেই বলছেন অনেকে। স্বাগত জানিয়েছে বিরোধী শিবিরও। জামায়াত আমীর এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, শুধু সাংগঠনিক নয়, তাঁর বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপও নিতে হবে।
জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে পদত্যাগ করেন সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন বিএনপি’র মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান। গত মে মাসে শপথ নেওয়ার চার মাসের মাথায় পদত্যাগ করলেন মিষ্টি।
স্পিকারের কাছে যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কারণ উল্লেখ না করে ‘সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায়’ পদত্যাগ করছেন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর ব্রিক্রম জরুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের ২৩ নম্বর সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি আমার অফিসে এসে লিখিতভাবে পত্র দিয়ে গিয়েছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, পত্রটি পাওয়ার পরই তার পদ শূন্য হয়ে গেছে।
বিএনপি সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁর নাম আসায় প্রধানমন্ত্রী হার্ডলাইনে চলে যান।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বুধবার রাতে ফেরদৌসীকে পদত্যাগের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে দল থেকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়ে দেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্র বলেছে, রাড্ডার ঘটনাটিকে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া, লুটপাট ও জমি দখলের অভিযোগের সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে সরকার বিব্রত। ঘটনার সঙ্গে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসার পর তাঁর ভূমিকা ও রাজনৈতিক দায়ও আলোচনায় এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের বিষয়ে আরো কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাটের পর ভবনটি গুঁড়িয়ে দেয়। রাড্ডা সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আলোচনায় আসে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নাম। তাদের এ কার্যক্রমেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন যুক্ত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ফেরদৌসী আহমেদ ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। তখন ওই সমিতির নামে রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে যে আবেদন করা হয়েছে, তাতে সভাপতি হিসেবে সই করেছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ।
মিষ্টি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মরহুম নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন। তার স্বামী সাঈদুর রহমান নিউটন ছিলেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা, যিনি ২০০২ সালে নিহত হন।
এদিকে, এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে শুধু সাংগঠনিক নয়, আইনি পদক্ষেপ চেয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা: শফিকুর রহমান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জামায়াতের আমীর বলেন, রাতের অন্ধকারে রাড্ডা ক্লিনিক দখলের ঘটনায় অবশেষে সরকার ও সরকারি দল বাধ্য হয়ে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। কিন্তু এত বড় অপকর্মের জন্য শুধু সাংগঠনিক পদক্ষেপ মোটেই যথেষ্ট নয়। ‘কালপ্রিটদের (অপরাধীদের) বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশবাসী দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য আইনি পদক্ষেপ দেখতে চায়। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ও লুণ্ঠিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণের দায়িত্বও সরকারকে পালন করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ওদিকে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন,
ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে থাকার পরও ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির প্রতি কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো হয়নি। নতুন যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সবসময় একটি অভিযোগ থাকে-তারা যেকোনো অপরাধকে ঢাকার চেষ্টা করেন। অপরাধী নিজ দলের লোকজনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না কিংবা তাদের একরকম প্রশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করেন। আজকের এই ঘটনা প্রমাণ পেল যে উনি (তারেক রহমান) কাউকে আসলে এ ধরনের কোনো প্রশ্রয় দিতে চান না-কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করলেন।





