নিয়ন্ত্রণহীন ব্রয়লার মুরগীর বাজার
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ মার্চ ২০২৬, ৮:০২:৪৮ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেটসহ দেশের ব্রয়লার মুরগীর বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বেশ কয়েকদিন ধরেই অস্থিতিশীল ব্রয়লার মুরগির বাজার। পোল্ট্রিখাতে কয়েকটি কোম্পানীর একচেটিয়া আধিপত্যের সুযোগ নিচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীরাও। রমজানের শুরুতে সিলেট নগরীতে ব্রয়লার মুরগী প্রতি কেজি ১৬০-১৬৫ টাকায় বিক্রি হলেও ২০ দিনের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৮০ টাকা পর্যন্ত। ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, মুরগির দাম আরও বাড়তে পারে, এমনটাই বলছেন বিক্রেতারা। দাম বাড়ায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ।
ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম এমন সময়ে বেড়েছে, যখন সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে নয় দশমিক ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্নআয়ের পরিবারে একটু ভালো খাবার মানেই ব্রয়লার মুরগি। সেই সঙ্গে এটি প্রোটিনের অন্যতম উৎস। সরবরাহ সংকটের অজুহাত তুলে নগরীর বাজারগুলোতে দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এতে আরও বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। মাত্র এক সপ্তাহে মুরগির দাম এতটা বেড়ে যাওয়া নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বড় ধাক্কা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিনমজুর সৌরভ মিয়া সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ন্মি আয়ের মানুষেরা।
তথ্য বলছে, দেশের ব্রয়লার মুরগীর ৮৫ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করে কাজী ফার্মস, নারিশ, প্যারাগন, আফতাব, কোয়ালিটি, প্রোভিটা, সিপি ও ডায়মন্ড এগ। বাকি ১৫ শতাংশ শেয়ার প্রান্তিক খামারীদের হাতে। এই শীর্ষ কোম্পানীগুলো দেশের ব্রয়ার মুরগীর বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এসব কোম্পানী মুরগির বাচ্চা ও খাদ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ান বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে পুরো বাজারে এর প্রভাব পড়ে।
জানা গেছে, উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রতি কেজি মুরগি খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদনে খরচ হয় করপোরেট পর্যায়ে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। তবে খুচরা খামারি পর্যায়ে এই খরচ হয় ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
তবে ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পোল্ট্রির চাহিদা বেড়েছে, তবে সে অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ বাড়েনি।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) নগরীর লাল বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ক’দিন আগে প্রতি কেজির দাম সর্বোচ্চ ২৪০ টাকায় উঠেছিল। যদিও রমজানের শুরুতে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে ব্রয়লার মুরগী। তবে নগরীর অন্য বাজারগুলোতে ২৩০-২৩৫ টাকায় এখনও ব্রয়লার মুরগী বিক্রি হচ্ছে। অপরদিকে এক হালি ডিম বিক্রি হয়েছে ৪০-৪৫ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩৬ টাকা। লাল বাজারের ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, গত সপ্তাহজুড়ে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজিতে দাম প্রায় ৪০ টাকা বেড়েছে। তাই খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, রমজান ও ঈদের আগে একদিন বয়সী বাচ্চা মুরগির দাম হঠাৎ করে ৩০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা বেড়ে ৯০-৯৫ টাকা হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে একদিকে ছোট খামারিরা তাদের পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ভোক্তাদেরও বেশি দামে মুরগি কিনতে হচ্ছে।
কাজী ফার্মসের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান বলেন, ডিমের উৎপাদন স্থিতিশীল না। কারণ খামারিরা পুরোনো মুরগি বিক্রি করলে বা নতুন মুরগি ডিম দেওয়া শুরু করলে সরবরাহের পরিবর্তন হয়। ভোক্তাদের চাহিদাও একেক সময় একেক রকম থাকে। শীতকালে মানুষ মৌসুমি সবজিতে বেশি কেনে এবং ডিম বিক্রি তুলনামূলক কমে যায়। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন সরবরাহ বেশি থাকায় ডিমের দাম কম ছিল। সম্প্রতি উৎপাদন কমে যাওয়া বা চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হয়তো দাম বেড়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বাপন দে বলেন, পোলট্রি খাত অসহনীয় হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। দিন দিন পোলট্রি খাতে প্রান্তিকদের হার কমে যাচ্ছে। অপরদিকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনের হার বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারের মূল্যের পেছনে তাদের ভূমিকা দিনদিন বাড়ছে। নীতিমালা অনুযায়ী, একই সঙ্গে খাদ্য ও বাচ্চা উৎপাদনের পাশাপাশি কোম্পানিগুলো মুরগি ও বাচ্চা উৎপাদন করতে পারে না। তিনি বলেন, সরকারের ন্যাশনাল পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি আছে। কে কী করতে পারবে সেটা সেখানে উল্লেখ আছে। কিন্তু এর বাস্তবায়নে সরকার ও বেসরকারি সবারই সদিচ্ছার অভাব আছে। পোলট্রি খাতে খামারিরা অনেক সময় অনেক লোকসানও গোনেন। নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়া প্রয়োজন। তাহলে বাজার এমন অসহনশীল হওয়ার কথা না।





