মৌলভীবাজারে কমছে পানি, সুনামগঞ্জে বাড়ছে
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ৮:৩৮:১৪ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : বৃষ্টিপাত কমায় মৌলভীবাজারে কমতে শুরু করেছে নদ-নদীর পানি| উজানের হাওরের পানি কমায় বোরো ধান ভেসে উঠছে| পানির নিচে ধান ভেসে উঠায় ধান কাটতে ব্যস্ত কৃষকরা| অপরদিকে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) বৃষ্টি কম হলেও সুনামগঞ্জের হাওরে বাড়ছে পানি| পানির নিচে তলিয়ে আছে কৃষকের স্বপ্ন| নিচু এলাকার হাওরে পানি বাড়ায় বোরো ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন কৃষকরা|
জানা গেছে, জেলার কুশিয়ারা, মনু ও ধলাই নদীর পানি কমেছে তবে জুড়ী নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে| পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যাওয়া বোরো ধান ক্ষেত দেখা যাচ্ছে| তবে হাওর এলাকা এখনও নিমজ্জিত|
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানি বৃদ্ধি পায়| তবে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে পানি কমতে শুরু করে| এখন পানি অনেকটা কমে গেছে|
সরেজমিনে জেলার কমলগঞ্জ, রাজনগর, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ পানির নিচে তলিয়ে গেলেও এখন পানি কমে গেছে| তবে হাওরের পানি কমেনি| হাওর এলাকা এখনো পানিতে টইটুম্বুর| মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, জেলার নদীগুলোর দ্রুত পানি নামছে| আশা করছি উজানে বৃষ্টি না হলে পানি আর বৃদ্ধি পাবে না|
এদিকে সুনামগঞ্জে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও তেমন বৃষ্টি হয়নি| গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত জেলায় ভারী বৃষ্টি না হলেও ঢলের পানিতে নদী ও হাওরে পানি বাড়ছে| টানা চার দিন রোদ না থাকায় কাটা ধান নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাওরের লাখো কৃষক| অনেক স্থানে পানি বেশি থাকায় ধান কাটা যাচ্ছে না, আবার কাটা ধানও শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে|
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, বুধবার সকাল নয়টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল নয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় বৃষ্টি হয়েছে ৮ মিলিমিটার| এ সময়ে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার| এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ২২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নদীর পানি বেড়েছিল ৫৬ সেন্টিমিটার| তবে গত সোমবার রাতের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলেই বড় ক্ষতি হয়েছে| সেদিন মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়, এতে হাওরের বোরো ধান ব্যাপক হারে তলিয়ে যায়|
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, গত দুই দিনে বৃষ্টি কম থাকাটা কিছুটা ¯^স্তির| তবে আজও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে| ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরামে বৃষ্টির কারণেই মূলত উজানে ঢল নামছে|
পাউবো জানায়, ঢল অব্যাহত থাকায় সুরমা ছাড়াও কুশিয়ারা, নলজুর, পাটলাই, জাদুকাটা, খাসিয়ামারা, বৌলাইসহ জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে| এসব নদীর পানি হাওরে ঢুকে জমির ধান তলিয়ে দিচ্ছে| ˆবরী আবহাওয়ার কারণে হাওরে ধান কাটতে পারছেন না কৃষকেরা| ঠান্ডা ঢলের পানি ও প্রবল বাতাসে দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে| রোদ না থাকায় মাড়াই করা ধানও শুকাতে পারছেন না অনেকে|
সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের কৃষক বশির মিয়ার (৪৫) দুই একর জমির ধান এখনো কাটা হয়নি| শ্রমিক না পাওয়ায় তিনি গতকাল ছেলেকে নিয়ে কোমরপানিতে নেমে ধান কাটেন| তিনি বলেন, ইবারের লাখান ঠান্ডা ঢলের পানি আগে দেখছি না| হাত পাও টাখরি লাগাই দেয়| পানিত থাকা যায় না| এর লগে আছে বাতাস|
কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাওরে ৯ হাজার ৫৭ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৭ হেক্টর| এর আগে জলাবদ্ধতায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টর ক্ষতির কথা জানানো হয়েছিল| তবে হাওর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তরা এ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন| তাঁদের দাবি, বাস্তবে প্রায় অর্ধেক ধানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে|
কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, এখনো হাওরের প্রায় অর্ধেক ধান জমিতে রয়েছে| এবার জেলায় ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে| গত মঙ্গলবার পর্যন্ত কাটা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ২৮৫ হেক্টর| এর মধ্যে নিচু জমির প্রায় ৭০ শতাংশ এবং উঁচু জমির ১৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে| গড়ে অগ্রগতি ৪৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ|
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারুক আহাম্মেদ বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান কাটায় সমস্যা হচ্ছে| তিনি কৃষকদের পরামর্শ দেন, কাটা ধান খলায় না রেখে বাড়ি বা উঁচু স্থানে রাখতে হবে| শুকানোর আগে ধান বস্তাবন্দী না করে মেঝে, ভবনের ছাদ বা উঁচু সড়কে ছড়িয়ে রাখতে হবে, যাতে বাতাস লাগে| প্রয়োজনে ˆবদ্যুতিক পাখা ব্যবহার করেও ধান শুকানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে| এতে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব|




