কার্যক্রমে স্থবিরতা : স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে?
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৭:১৬ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রশাসনে এক ধরণের স্থবিরতা তৈরি করেছে। আর এ কারণেই নির্বাচিত সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নজর সবার। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার বিষয়ে সরকারের আগ্রহ কতটা?
এ নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ অনেকের মধ্যে এক ধরণের সন্দেহও তৈরি করেছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বিভিন্ন সময় বলেছেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন। গতকাল সোমবার আবারও তিনি একই ভাষায় কথা বলেছেন। জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম ১৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর এমপি জহিরুল ইসলামের এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। ধাপে ধাপে অনুষ্ঠানে সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতে ১০ মাস থেকে এক বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা প্রস্তুত, ভোটের সামগ্রী সংগ্রহ, ধর্মীয় উৎসব, পাবলিক পরীক্ষা, আওহাওয়া, কেন্দ্র চূড়ান্তকরণ ও সংস্কার, নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে তফসিল ঘোষণা করতে হয়। তফসিল ঘোষণার প্রাক প্রস্তুতি হিসেবে ন্যূনতম ৪৫ পঞ্জিকা দিবস প্রয়োজন হয়।
এদিকে, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক হিসেবে দলীয় নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার পর নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদের বিরোধী দলগুলো।
দেশের ১১ সিটি করপোরেশন ও ৪২ জেলা পরিষদে বিএনপির দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিলম্বিত করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াত ও এনসিপি মনে করে, ভোট ছাড়াই দলীয় নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। দল দুটি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম গতকাল বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপি গড়িমসি করছে। তারা প্রশাসন দলীয়করণ করেছে। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন বাস্তবায়নে জোর চেষ্টা চালাব। একই সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রস্তুতিও রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢালাওভাবে দলের নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই স্থানীয় প্রশাসন নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকারি দল। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইস্যুতেই দেশের রাজনীতির মাঠ সরব থাকবে বলেও মনে করেন তারা। তাদের অনেকেই বলছেন, আপাতত প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন সচল করার বিকল্প ছিল না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন জরুরী?
জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই এক ধরনের অচলবস্থা চলছে দেশের স্থানীয় সরকার প্রশাসনে। আন্দোলনের মুখে সাবেক সরকার প্রধান শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে স্থানীয় প্রশাসন।
সে সময় সিটি কর্পোরেশন কিংবা জেলা পরিষদে দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধিদের কেউ হামলার শিকার হন, কেউ গ্রেফতার হন, আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। যার ফলে স্থানীয় সরকার প্রশাসনে তৈরি হয় শূণ্যতা।
পরে স্থানীয় সরকার প্রশাসন আবারও সচল করার লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এছাড়া দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে কোথাও সরকারি কর্মকর্তা আবার কোথাও প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন।
এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের ওই উদ্যোগ কতটা কাজে এসেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দেড় বছর ধরে চলা ওই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা এবং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট স্থানীয় প্রশাসনে অচলবস্থা তৈরি করেছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ফলে এখন সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা উচিৎ বলে মনে করেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাবে, যদি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা তারা করতে না পারে।
এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রশাসনে এখন পর্যন্ত যে নিয়োগগুলো সরকার দিয়েছে, সেটি এরই মধ্যে নানা সমালোচনা তৈরি করেছে বলেও মনে করেন মি. আহমদ।
তিনি বলছেন, স্থানীয় সরকারে দলীয়করণটা জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের ওপর এর একটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।”
এছাড়া নির্বাচনের পর স্থানীয় প্রশাসনে সরকার যেভাবে দলীয় নেতাদেরকে নিয়োগ দিয়েছেন সেটি নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম অবশ্য বলছেন, প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া অবৈধ কিছু নয়, নির্বাচিত রাজনৈতিক দল তার মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধি আর কারো মনোনীত ব্যক্তি – এক বিষয় নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মানুষের ওপর একটা দায়বদ্ধতা থাকে, যেটি অনেক ক্ষেত্রে একজন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকের নাও থাকতে পারে।




