ঊর্ধ্বমুখী ডিমের দাম, ডজনে বেড়েছে ৫০ টাকা
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ মে ২০২৬, ৮:৩৯:০৩ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে বাজারে উর্ধ্বমুখী ডিমের দাম| অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামের চাপের মধ্যে নিম্ন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যখন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখন ডিমের দাম যেন ‘আগুনে ঘি ঢেলেছে’| মাসের ব্যবধানে ডজনপ্রতি ডিমের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা| ডিমের অস্বাভাবিক এই দাম বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বিপাকে সীমিত আয়ের মানুষ|
সিলেট নগরীর বন্দরবাজারে বড় দোকানগুলোতে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৬০ টাকায়| আবার কিছু এলাকার দোকানে এ দাম ১৭০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে| অথচ মাত্র এক মাস আগে এক ডজন ডিমের দাম ছিল ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে| অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে ডজনপ্রতি ডিমের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০-৬০ টাকা|
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে চাহিদা বাড়ার কারণে ডিমের দাম কিছুটা বাড়ে| তবে এবার অল্প সময়ের মধ্যে দাম বৃদ্ধির হার তুলনামূলক অনেক বেশি এবং অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে| এ ধরনের পরিস্থিতি এর আগেও দেখা গেছে| ২০২২ সালেও ডিমের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল| সে সময় দাম বাড়ার কারণ অনুসন্ধানে মাঠে নামে সরকার| জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) ছাড়াও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দল বাজার তদারকিতে অংশ নেয়| ওই সময় দেখা যায়, ডিম উৎপাদনকারী বড় ফার্মগুলো কমিশন এজেন্টের মাধ্যমে দাম কারসাজি ও নিলাম প্রক্রিয়ায় নিজেদের নিয়োগ করা এজেন্ট ব্যবহার করে ডিমের দাম বাড়িয়েছে| ডিএনসিআরপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে|
তথ্য বলছে, দেশে ক্রমাগত ডিমের উৎপাদন বাড়ছে| সবশেষ গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দুই হাজার ৪৪০ কোটি পিসেরও বেশি ডিম উৎপাদন হয়েছে দেশে| দশ বছর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৯১ কোটি পিস| বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি পিস ডিম উৎপাদন হচ্ছে|
যদিও উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডিমের চাহিদা বাড়ছে| এখন বহু ধরনের খাদ্যপণ্যে ডিমের ব্যবহার বেড়েছে| যে কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে ডিমের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায়| এদিকে, এবারও এমন পরিস্থিতির ˆতরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার| ডিমের দাম বাড়ছে কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, করপোরেট কোম্পানি ও তাদের নিযুক্ত ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে ডিমের দাম বাড়িয়েছে| তিনি বলেন, ডিমের ক্রয়মূল্য যাই হোক না কেন, ডিম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সমিতিগুলো মোবাইল ফোনে দাম নির্ধারণে করে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে| গত মাসে দাম কম থাকায় প্রচুর ডিম মজুত করেছে তারা| এখন দাম অ¯^াভাবিক বাড়িয়ে মুনাফা করছে|
সুমন হাওলাদারের দাবি, বর্ষা ও সবজির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরপরই এ সময়কে ‘সঠিক সময়’ হিসেবে বেছে নিয়েছে সিন্ডিকেট| এ বর্ধিত দামের কোনো সুবিধা প্রান্তিক খামারিরা পাচ্ছেন না|
ডিম কি আসলে অবৈধ মজুত হয়েছে? এমন প্রশ্নে সুমন হাওলাদার দাবি করেন, এখন প্রচুর ডিম মজুত হচ্ছে| তখন প্রশ্ন আসে এ গরমে ডিম কি আসলে মজুত করা সম্ভব? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখন একটি ডিম স্বাভাবিকভাবে ১০-১৫ দিন ভালো থাকে| হিমাগারে আরও বেশি সময়| তবে যারা মজুত করেন, তারা শুরুতে আগের মজুত করা পুরোনো ডিম বিক্রি করেন| এরপর নতুন ডিম মজুত রাখেন| এভাবে পালাবদলের মাধ্যমে ডিমের মজুত সম্ভব|
২০২৪ সালেও ডিমের দাম বেড়েছিল মে মাসে| ওই সময় বাজারে প্রতি ডজন ডিমের দাম আবার ১৫০ টাকায় ওঠে| সে সময়ও ডিম হিমাগারে মজুত করে বাজার অস্থিতিশীল করার অভিযোগও ছিল বড় বড় কোম্পানি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে|
ডিমের দাম বৃদ্ধি ও সরকারের নজরদারির অভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ডিমের দামের কারণে গরিব মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে| কিন্তু সরকার সে বিষয়টি নিয়ে কিছুই করছে না| ভোক্তা অধিকার কিংবা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বাজার তদারকি বা কার্যক্রম চোখে পড়েনি|
বাংলাদেশ এগ প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. তাহির আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, দেশের জাতীয় চাহিদা মেটাতে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ কোটি ডিম প্রয়োজন হয়| এই ডিমগুলোর একটি বড় অংশ সারাদেশের খামার থেকে আসে|
দেশে কাজী ফার্মস, ডায়মন্ড এগ, প্যারাগন পোল্ট্রি, নর্থ এগ, সিপি বাংলাদেশ, আফিল অ্যাগ্রো, পিপলস পোল্ট্রি, নবিল অ্যাগ্রো, ভিআইপি শাহাদত, রানা পোল্ট্রি, ওয়েস্টার পোল্ট্রিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বাণিজ্যিকভাবে ডিম উৎপাদনের শীর্ষে| এর মধ্যে কিছু কোম্পানি রয়েছে যাদের দৈনিক ডিম উৎপাদন ১৫ লাখ পিসের কাছাকাছি| অনেকগুলো কোম্পানি প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ লাখ পিস ডিম উৎপাদন করছে| বাকি জোগান আসে সারাদেশের প্রান্তিক খামার থেকে|





