সিলেটে হামে আরো ৩ শিশুর মৃত্যু
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ জুলাই ২০২৬, ১১:১০:২০ অপরাহ্ন
মৃত্যু বেড়ে ১০৩, সর্বোচ্চ সুনামগঞ্জ

স্টাফ রিপোর্টার : টিকাদানের সফলতার কারণে কিছুদিন নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম সিলেটে আবারও ভয়াবহ রূপে ফিরে আসছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে বাড়ছে শিশু রোগীর ভিড়, বাড়ছে উদ্বিগ্ন অভিভাবকের সংখ্যা। সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের বিষয়-মৃত্যুর মিছিল থামছে না।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুবরণকারী ১ বছর ৫ মাস বয়সী তাসফিয়া হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং, ১ বছর ৭ মাস বয়সী আব্দুল্লাহ সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ ও ৮ মাস বয়সী তানভীর সুনামগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বাসিন্দা।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে নতুন করে ল্যাব পরীক্ষায় কারো হাম শনাক্ত না হলেও এই সময়ে হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরো ৫৮ জন।
এনিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছেন ১০৩ জন। তাদের মধ্যে ১০২ জনই শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মৃতদের মধ্যে মাত্র চারজনের ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হয়েছে। তবে বাকি সবাই হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। চিকিৎসকদের মতে, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি বা অন্য জটিলতা যুক্ত হলে শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।
একের পর এক নিভছে শিশুর প্রাণ :
গত ২৪ ঘন্টায় মারা যাওয়া তিন শিশুর বয়সই দুই বছরের নিচে। একজনের বয়স মাত্র আট মাস, অন্য দুজনের বয়স দেড় বছরের কাছাকাছি। এই চিত্রই বলে দিচ্ছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এক থেকে দুই বছর বয়সী শিশুরা। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বয়সে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না। নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা টিকা না পাওয়া, অপুষ্টি এবং চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ :
সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সুনামগঞ্জে। এখন পর্যন্ত সেখানে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ল্যাব পরীক্ষায় ২৮৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। সিলেট জেলায় ৩৫ জন, মৌলভীবাজারে ১২ জন এবং হবিগঞ্জে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ২৬৫ জন সন্দেহভাজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি।
কেন বাড়ছে হাম?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে খুব সহজেই অনেকের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে- নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে কিছু শিশুর বাদ পড়ে যাওয়া। প্রত্যন্ত এলাকায় টিকাদানের কম কভারেজ। অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি।
অপুষ্টি ও ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব। আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে আসতে বিলম্ব।
স্বাস্থ্য বিভাগের করণীয় :
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম সেখানে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে টিকাবঞ্চিত শিশুদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি জ্বর ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
অভিভাবকদের জন্য সতর্কবার্তা :
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুর জ্বরের সঙ্গে চোখ লাল হওয়া, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং পরে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা, পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ :
সিলেটে হামের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্যসংকট নয়; এটি টিকাদান কর্মসূচি, জনসচেতনতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া গেলে অধিকাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
শিশুর জীবন রক্ষায় এখন প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ প্রতিটি বিলম্ব মানেই হয়তো আরেকটি পরিবারের কোলে নেমে আসবে অপূরণীয় শোক।ানি অপসারণ এবং জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।






