সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি : ৩সি ভূরাজনীতিতে নতুন মোড়
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৮:২৪ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : পশ্চিম এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তিতে নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে এবং অনেক কিছু বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বৃহস্পতিবার তিনদিনের সরকারি সফরে সৌদি আরবে গেছেন। একই সময়ে সৌদি আরব সফরে গেছেন প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান। তিন দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে আগে থেকেই প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, এক দেশের ওপর আগ্রাসন হলে অন্য দেশ সহযোগিতা করবে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আলোচনার পর এই প্রতিরক্ষা কাঠামো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই নিরাপত্তা কাঠামোয় তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রিপাক্ষিক এই জোট আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলার জেরে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেও প্রভাবিত করছে। এই প্রেক্ষাপটে নেটো সদস্য তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
এদিকে, তিনটি দেশের শীর্ষনেতাদের বৈঠক এবং তাদের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা জোট ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা। এদিকে ইসরায়েল ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধু। অন্যদিকে, পাকিস্তান ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ফলে একদিকে যখন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সমীকরণ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, তেমনই ভারত-ইসরায়েলের শীর্ষনেতাদের মধ্যে বার্তালাপও বিশেষভাবে অর্থবহ।
পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষনেতৃত্বের সৌদি আরব সফর :
শাহবাজ শরিফের তিন দিনের সৌদি আরব সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল।
এই প্রসঙ্গে শরিফের কার্যালয়ের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল, আঞ্চলিক পরিস্থিতির স্বল্পমেয়াদী প্রভাবের প্রেক্ষাপটে এই সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং সমন্বয় ও অংশীদারিত্বকে আরও প্রসারিত করবে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবারই স্পষ্ট হয়ে যায় যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও সৌদি আরবে পৌঁছাচ্ছেন। তুরস্কের তরফে জানানো হয় সৌদি সফরে এরদোয়ান, মোহাম্মদ বিন সালমান এবং শাহবাজ শরিফের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন। তারপর থেকেই ত্রিপাক্ষিক এক অক্ষের সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়ে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করা হলেও রয়টার্স -সহ একাধিক সংবাদ মাধ্যম সৌদি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে, এই তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত সমঝোতা নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
অনেক কিছু বদলে যেতে পারে :
ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিন দেশের শীর্ষনেতৃত্বের সাক্ষাতের ঠিক আগেই তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাতি, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের মধ্যে জর্ডানে একটি বৈঠক হয়েছিল। মিশর, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক নিয়ে গঠিত এই কূটনৈতিক জোট ‘আর-ফোর’ নামে পরিচিত।
মার্চ মাসে রিয়াদে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর চালু হওয়া এই ‘আর-ফোর’ মেকানিজমের লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাব সীমিত করা, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সমন্বয় বৃদ্ধি করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঝুঁকির মোকাবিলা করা।
এই আবহে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা জোট ইসরায়েলের স্বার্থে যাবে না বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সৌদি গণমাধ্যমেও এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে।
ড. মুহাম্মদ মাজহার শাহিন এক্স-এ লিখেছেন, যদি এই জল্পনাগুলি সত্যি হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে এবং অনেক কিছু বদলে যেতে পারে।
কেন ভারত ও ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ :
তিন দেশের এই বৈঠক ভারত ও ইসরায়েলের জন্যও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এরই মাঝে বৃহস্পতিবার রাতে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। কৌশলগত অংশীদারিত্বে ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থে বিভিন্ন খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তবে অনুমান করা হচ্ছে শাহবাজ শরিফ ও রেচেপ তাইপ এরদোয়ানের সৌদি সফরও এই বার্তালাপের নেপথ্যে ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞ কমার আঘা এর মতে, এক্ষেত্রে একাধিক সমীকরণ কাজ করছে। তার কথায়, ভারতের কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে ইসরায়েল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। ভারত-ইসরায়েল-সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্রিপক্ষীয় জোট অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি বিনিময়, নিরাপত্তার অংশীদারিত্বের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ও ভারতের মধ্যে জ্বালানি, বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা কেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে।






