উদ্বেগ জাগাচ্ছে অর্থনীতির তিন সূচক
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৪৬:৪২ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : ডলারপ্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। উল্টো শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি আমদানি কমছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে আটকে আছে। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতিও নেমেছে তলানিতে।
অর্থনীতির এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকই বলছে, নতুন বিনিয়োগের গতি দুর্বল। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ কম। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বিনিয়োগে এই স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পথে বাধা তৈরি হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অস্থিরতার পর গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সরকারের মেয়াদের প্রায় আট মাসেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানিবিষয়ক তথ্য বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-অগাস্টে দেশে ৫০ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৫ কোটি ৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ।
অন্যদিকে, একই সময়ে সব ধরনের পণ্য আমদানির ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জুলাই-আগস্টে আমদানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এর অর্থ হচ্ছে, সামগ্রিক আমদানি বাড়লেও ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা কলকারখানা স্থাপন বা সম্প্রসারণে আগের চেয়ে যন্ত্রপাতি আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন, যা দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শুধু মূলধনি যন্ত্রপাতি নয়, শিল্পকারখানার অন্যান্য মূলধনি পণ্য আমদানিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এসব পণ্যের আমদানি হয়েছে ১০৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১২৫ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের তুলনায় ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ কম। সব মিলিয়ে শিল্প খাতের মূলধনি পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৬০ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল প্রায় ২০০ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ মোট আমদানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
পুরো অর্থবছরের হিসাবেও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ওঠানামা দেখা যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে আমদানি হয়েছিল ৩২০ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের ৩০৫ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের তুলনায় ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ৫১৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৪৯৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের। এরপরের বছরগুলোতে আমদানির পরিমাণ ওঠানামা করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জুলাই শেষে তা ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এই প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছিল, যা তখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন ছিল। মে মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ গত কয়েক মাসে সামান্য ওঠানামা হলেও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচেই রয়েছে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের দুর্বলতার পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন ব্যয়েও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ২ শতাংশেরও নিচে নেমেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপির আওতায় ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এটি পুরো কর্মসূচির ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
আগের অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সে সময় ব্যয় হয়েছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং ব্যয় হয়েছিল ৭ হাজার ১৪৩ কোটি ৮ লাখ টাকা।
৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই অর্থবছরের জন্য এপ্রিলে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ পূর্বাভাস কমানো হয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, জ্বালানি খাতের সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাপে রেখেছে। বিনিয়োগ কার্যক্রম দুর্বল হয়েছে, রপ্তানির গতি কমেছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়েছে। সংস্থাটি ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে এর জন্য জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে বিশ্ব ব্যাংক। বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাস সত্যি হলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি করোনাভাইরাস মহামারীর প্রথম বছরের ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়েও কমে যাবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অগাস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জ্বালানি ব্যয়, উচ্চ সুদহার এবং উৎপাদন খরচের চাপ নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তুলছে বলে ব্যবসায়ীদের ভাষ্য।
বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি ও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, নতুন বিনিয়োগ হবে কী করে ? কে করবে বিনিয়োগ ? বিনিয়োগ করলে রিটার্ন আসবে সে নিশ্চয়তা দেবে কে ? যেগুলো আছে, সেগুলোই টিকিয়ে রাখাই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিন বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তো এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এখনও। তার প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতেও পড়ছে। এই সময়ে তো খুব বেশি ঋণ বাড়বে না।






