হুতির তান্ডবে নিরাপত্তা-সঙ্কটে সৌদি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮:১৫:৪৫ অপরাহ্ন
এক বাঙ্কার থেকে অন্য বাঙ্কারে পালিয়ে যুবরাজ
জালালাবাদ রিপোর্ট : ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের লাগাতার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রহানায় চরম নিরাপত্তা-সঙ্কটের মুখে পড়েছে সৌদি আরব। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে ৪১ বছর বয়সি সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনকে কড়া নিরাপত্তায় একাধিক বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত রাজপ্রাসাদে দফায় দফায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচির পর থেকে যুবরাজকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একটি বাহিনী তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নানা দেশের মধ্যে অশান্তি সত্ত্বেও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে উপস্থাপন করে আসছিল। কিন্তু সৌদির রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে হুতিদের প্রাণঘাতী হামলা সেই নিরাপত্তার অনুভূতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। ফলে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী পরিবারগুলো এখন দ্বিধায় পড়ে গেছে, তারা কি সত্যিই এই দেশে তাদের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার কাজ চালিয়ে যেতে পারবে?
ওদিকে, ক্রমেই বাড়ছে সংঘাতের ঝাঁজ। এবার সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল শোধনাগার আরামকোতে ভয়ংকর হামলা চালাল ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিরা। তারপরই আগুন লেগে যায়। বুধবার এমনটাই জানাল রিয়াদ। তবে ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কোনও হতাহতের খবর মেলেনি। সম্প্রতি একটি ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে (ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল)। সেখানে দেখা গেছে, তেল পরিশোধনাগার থেকে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। এর পাল্টা আবার ইয়েমেনের রাজধানী সানায় প্রত্যাঘাত করেছে সৌদির বাহিনী।
সৌদির তরফে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার দেশের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে আছড়ে পড়ে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র। এরপরই ভবনটিতে আগুন লেগে যায়। যদিও বড়সড় বিপদ হয়নি বলেই দাবি সৌদি সরকারের।
অন্যদিকে, শনিবার পর্যন্ত রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রাখার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
বিমানবন্দরে দফায় দফায় হামলা :
গত এক দশকের মধ্যে সৌদিতে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটে গত শনিবার। বিমানবন্দরে হুতিদের ওই হামলায় ভারতীয় নাগরিক ইউসুফ আলি ছাড়াও চার জন সৌদি নাগরিক, দুই বাংলাদেশি, এক জন মার্কিন, এক প্যালেস্টাইনি এবং মিশর, জর্ডন, সিরিয়া ও সুদানের এক জন করে নাগরিক-সহ অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি আহত হন। হামলার জেরে টার্মিনাল-৪-এ বিধ্বংসী আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এর পর রবিবারেও একটি পৃথক হামলায় এক জনের মৃত্যু হয় ও ১১ জন আহত হন।
গত পাঁচ দিনে চার বার এই বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে হুতিরা। হুতিদের এক মুখপাত্র দায় স্বীকার করে স্পষ্ট জানিয়েছেন, সৌদির বিমানবন্দরগুলিতে হামলা জারি থাকবে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শনিবার পর্যন্ত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি অসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ।
ফ্লাইট গবেষণাসংস্থা ‘সিরিয়াম’-এর তথ্য অনুযায়ী, অচলাবস্থার জেরে রিয়াদের প্রায় ৬০ শতাংশ নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। মার্কিন সংস্থা ‘ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান নিরাপত্তাসংস্থা ‘ইএএসএ’ সৌদির আকাশপথ ব্যবহারে চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করেছে।
হুতিদের এই আক্রমণের জবাবে সৌদির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন সালমান হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, হামলার ভয়াবহতা অনুযায়ী সৌদির প্রতিক্রিয়াও সমপর্যায়ের হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির বিমানহামলায় সরাসরি যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে আমেরিকা।
তবে রিয়াদের কর্মকর্তারা গোপনে স্বীকার করছেন, মুহুর্মুহু হামলা রুখতে গিয়ে তাঁদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের (ইন্টারসেপ্টর) মজুত কার্যত ফুরিয়ে আসছে। ঘাটতি মেটাতে ফ্রান্স, ব্রিটেন, পাকিস্তান ও মিশরের কাছে জরুরি সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে স্বয়ং আমেরিকার নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারেও টান পড়েছে।
সংঘাতের নেপথ্যে
২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব সরাসরি হস্তক্ষেপ করার পর থেকেই মূলত হুতিদের সঙ্গে এই লড়াইয়ের সূচনা। দীর্ঘদিন পর ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু গত জুলাইয়ে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হতেই সেই শান্তি ভেস্তে যায়। ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দর থেকে হুতি প্রতিনিধিদের নিয়ে তেহরানগামী এক ইরানি বিমানে সৌদি বাহিনী গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠার পর থেকেই পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।
সংঘাত কমাতে রবিবার রাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ফোনে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সামরিক আগ্রাসন এড়িয়ে রিয়াদকে রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার বার্তা দিয়েছে তেহরান। পাশাপাশি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই লড়াইয়ের ফলে আরব উপদ্বীপে অস্থিরতা বাড়ছে এবং এতে লাভবান হচ্ছে একমাত্র ইসরায়েল।





