অধিগ্রহণের গ্যাঁড়াকলে সিলেটের গ্যাস অনুসন্ধান
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ৫:০৬:২৬ অপরাহ্ন
৬৪৬ কোটি টাকার প্রকল্পে দুই বছরে অগ্রগতি ১৬ শতাংশ

মামুন পারভেজ: দেশের গ্যাসসংকট মোকাবিলায় সিলেটে দুটি অনুসন্ধান কূপ খননের জন্য নেওয়া ৬৪৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার প্রকল্পে দুই বছরেও শুরু হয়নি মূল খননকাজ। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, স্থানীয় জমির মালিকদের আপত্তি ও সংযোগ সড়ক নির্মাণে ধীরগতির কারণে আটকে আছে জৈন্তাপুরের ডুপিটিলা-১ ও গোলাপগঞ্জের কৈলাসটিলা-৯ কূপের কাজ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও খনন শুরু হয়নি। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ১৬ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (এসজিএফএল)। সংস্থাটির দাবি, প্রকল্প অনুমোদনে চার মাস বিলম্ব এবং জমি হুকুমদখলের পরিবর্তে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রায় এক বছর সময় নষ্ট হয়েছে। তবে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক।
অনুমোদনে চার মাস বিলম্ব, এরপর জমি নিয়ে জটিলতা
এসজিএফএলের আওতায় প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি। ফলে প্রকল্পের নির্ধারিত দুই বছরের মেয়াদের প্রায় চার মাস চলে যায় অনুমোদন পেতেই।
প্রকল্প পরিচালক ও এসজিএফএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশলী) মো. মুশতাক আহমেদ বলেন, প্রকল্পের শুরুতে দুটি অনুসন্ধান কূপের জন্য জমি হুকুমদখল বা ভাড়ার ভিত্তিতে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুসন্ধান কূপের ক্ষেত্রে জমি হুকুমদখল এবং উন্নয়ন কূপের ক্ষেত্রে অধিগ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তবে ভূমি আইন অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের আগে জমি হুকুমদখল বা অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করা যায় না।
তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের পর ২০২৫ সালের ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি দুটি কূপের জমি হুকুমদখলের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই বছরের নভেম্বর মাসে হুকুমদখল প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও স্থানীয় জমির মালিকেরা এতে আপত্তি জানান। তাঁদের জমি ধান চাষের জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় হুকুমদখলের পরিবর্তে অধিগ্রহণের দাবি তোলেন তাঁরা। এ নিয়ে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়। পরে বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হলে জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মুশতাক আহমেদের ভাষ্য, হুকুমদখলের পরিবর্তে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রকল্পের কাজে প্রায় এক বছর বিলম্ব হয়েছে।
জমির মালিকদের আপত্তি, এখনো কাটেনি সব জটিলতা
বাঘা এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, জমি হুকুমদখল নিয়ে মালিকদের আপত্তি ছিল। তাঁদের দাবি ছিল, জমি ভাড়া বা হুকুমদখলের পরিবর্তে অধিগ্রহণ করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও এসজিএফএলের কর্মকর্তারা জমির মালিকদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন।
তবে কিছু জমির মালিকের নামজারি ও ভূমির রেকর্ডসংক্রান্ত সমস্যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানান তিনি। তাই জমির টাকাও বুঝে পাননি তাঁরা। টাকা পেলে সংশ্লিষ্ট মালিকেরাও জমি হস্তান্তরে আপত্তি করবেন না।
এসজিএফএলের উপমহাব্যবস্থাপক মুশতাক আহমেদ বলেন, কৈলাসটিলা-৯ কূপের জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ হয়েছে। অধিগ্রহণের অর্থও জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে কিছু জমির মালিকের দলিল থাকলেও রেকর্ডে তাঁদের নাম নেই। এ কারণে জমির মালিকানা ও ক্ষতিপূরণ নিষ্পত্তিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ অধিগ্রহণের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগোলেও মাঠপর্যায়ে সব জমি নির্বিঘ্নে ব্যবহার করার পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। ফলে অবশিষ্ট জটিলতা কবে কাটবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সংযোগ সড়কের কাজ অসম্পূর্ণ, খনন শুরু হয়নি
প্রকল্পের আওতায় ডুপিটিলা-১ কূপের জন্য ৭৮৩ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২৩২ মিটারের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৫৫১ মিটার সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি সেতু ও কালভার্টের কাজও অসম্পূর্ণ। অন্যদিকে কৈলাসটিলা-৯ কূপের ভূমি উন্নয়নকাজ শুরু করতেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পের খননকাজের জন্য ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি চুয়ানছিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিডিসি) সঙ্গে ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চুক্তি করে এসজিএফএল। চুক্তিতে খননকাজের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মালামাল সরবরাহ, ভূমি উন্নয়ন, পূর্তকাজ ও প্রকৌশলসেবা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এসজিএফএলের প্রকল্প অগ্রগতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই কৈলাসটিলা-৯ এবং একই বছরের ৬ অক্টোবর ডুপিটিলা-১ কূপের জমি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি ডুপিটিলা-১ কূপের ভূমি উন্নয়নকাজ শুরু হয়। এরপরও নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মূল খননকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির সময় জমি ও সংযোগ অবকাঠামো প্রস্তুতির অগ্রগতি কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জমি প্রস্তুত না থাকায় ঠিকাদারের কাজ শুরুর সময়সূচি পরিবর্তিত হয়েছে কি না, এ কারণে কোনো অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়েছে কি না এবং চুক্তিতে বিলম্বজনিত জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে কি না, সেসব তথ্যও প্রকল্পটির আর্থিক যৌক্তিকতা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।
১৬ শতাংশ অগ্রগতির হিসাব যেভাবে
প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে মুশতাক আহমেদ বলেন, ডুপিটিলা-১ কূপের ভূমি উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছে। কূপের স্থানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি উন্নয়নের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। সংযোগ সড়কের প্রায় ৭৮৩ মিটারের মধ্যে ২৩২ মিটারের কাজ হয়েছে এবং একটি সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। এসব কাজের অগ্রগতি বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ১৬ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
তবে আইএমইডির হিসাবে গত আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতির মধ্যে এই পার্থক্যের কারণ, কোন কাজের বিপরীতে কত ব্যয় হয়েছে এবং ঠিকাদারকে এ পর্যন্ত কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য যেখানে দুটি অনুসন্ধান কূপ খনন, সেখানে খনন শুরু হওয়ার আগেই ভৌত অগ্রগতির বড় অংশ কোন কোন কাজের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সম্ভাব্য ৫৬ বিসিএফ গ্যাস, এখনো অনিশ্চিত প্রাপ্তি
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য দুটি অনুসন্ধান কূপ খননের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের মজুদ শনাক্ত করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডুপিটিলা-১ কূপের লক্ষ্য গভীরতা প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ মিটার এবং কৈলাসটিলা-৯ কূপের প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার।
এসজিএফএলের হিসাব অনুযায়ী, কূপ দুটিতে গ্যাস পাওয়া গেলে প্রথম পাঁচ বছর প্রতিদিন মোট ২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরবর্তী পাঁচ বছর প্রতিদিন মোট ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ হিসাবে ১০ বছরে মোট ৫৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা ধরা হয়েছে।
তবে অনুসন্ধান কূপ খনন ও পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগে এই পরিমাণকে নিশ্চিত গ্যাসের মজুদ বা উৎপাদন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ভূতাত্ত্বিক স্তর পরীক্ষা এবং কূপের উৎপাদনক্ষমতা যাচাইয়ের পরই প্রকৃত মজুদ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নির্ধারণ করা সম্ভব।
ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে শুধু সময় ও ব্যয়ের প্রশ্নই তৈরি হয়নি, সম্ভাব্য গ্যাস উৎপাদন শুরুর সময়ও পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। জাতীয় গ্যাস সরবরাহে নতুন উৎস যুক্ত করার যে প্রত্যাশা নিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হতে আরও কত সময় লাগবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মেয়াদ বাড়বে, ব্যয় বাড়বে না—দাবি এসজিএফএলের
প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর এসজিএফএল আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। বর্তমানে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে বলে জানিয়েছেন মুশতাক আহমেদ।
তিনি বলেন, আশা করা হচ্ছে, পরবর্তী জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হবে। জমি হুকুমদখলের পরিবর্তে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। তবে এতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে না বলে দাবি করেন তিনি।
মুশতাক আহমেদ বলেন, তাঁরা দরপত্রে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম মূল্যে কাজ পেয়েছেন। এ কারণে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের মোট ব্যয় বাড়ার প্রয়োজন হবে না বলে তাঁরা আশা করছেন।
তবে প্রকল্পের ব্যয় অপরিবর্তিত রাখার এ দাবি যাচাই করতে সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব, ঠিকাদারি চুক্তির মূল্য, এ পর্যন্ত ব্যয় এবং অবশিষ্ট কাজের প্রাক্কলন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সময় বাড়ানোর ফলে ঠিকাদারি চুক্তিতে কোনো আর্থিক প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
কবে শুরু হবে খননকাজ
প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ কবে পুরোপুরি শুরু করা যাবে জানতে চাইলে মুশতাক আহমেদ বলেন, স্থানীয় জমির মালিকদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
তবে কূপ দুটির মূল খননকাজ শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ, অবশিষ্ট জমির জটিলতা নিষ্পত্তির সময়সীমা এবং অসম্পূর্ণ সংযোগ সড়ক ও সেতুর কাজ শেষ করার পরিকল্পনা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সময়সূচি পাওয়া যায়নি।
সিলেটে নতুন গ্যাসের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুই বছরে মূল খননকাজ শুরু না হওয়া বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব, জমি হুকুমদখল থেকে অধিগ্রহণে পরিবর্তন এবং অবকাঠামো নির্মাণের ধীরগতির দায় নিরূপণ না করে শুধু মেয়াদ বাড়ানো হলে একই ধরনের অনিশ্চয়তা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নতুন সময়সীমার সঙ্গে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা, নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।





