তাহিরপুরে হাওরে দ্রুত পানি কমায় বোরো আবাদ নিয়ে শংকা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ৮:৫৩:৩৬ অপরাহ্ন

তাহিরপুর প্রতিনিধি: নির্ধারিত সময়ের আগেই সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বৃহত্তর শনি ও মাটিয়ান হাওর থেকে পানি দ্রুত কমে যাচ্ছে। এতে আসন্ন বোরো মৌসুমের চাষাবাদ নিয়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় পড়েছেন হাওরপাড়ের হাজারো কৃষক। পানির অভাবে বোরো ধানের বীজতলা তৈরি করতে গিয়ে বাড়তি খরচ ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তাঁরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ সময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা থাকলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি। ফলে বৃষ্টির পানির আশায় অনেক কৃষক প্রায় ১০ দিন বীজতলা তৈরির কাজ পিছিয়ে দেন। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় এবং হাওরে পানির পরিমাণ দ্রুত কমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে পানি সংকট। বাধ্য হয়ে দূরবর্তী স্থান থেকে পাইপের মাধ্যমে সেচযন্ত্র দিয়ে পানি এনে বীজতলা তৈরি করতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকদের অভিযোগ, একদিকে প্রাকৃতিক কারণে পানি ভূগর্ভস্থ স্তরে নেমে যাচ্ছে, অন্যদিকে হাওর রক্ষা বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ভাটির দিকে চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি স্লুইসগেট ও অন্যান্য নিষ্কাশনপথ দিয়েও পানি বের হয়ে যাচ্ছে। ফলে হাওরে পানির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনি ও মাটিয়ান হাওরের পানি দ্রুত কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। তবে অধিকাংশ কৃষক বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকায় বীজতলা তৈরিতে প্রায় ১০ দিন পিছিয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে, গত বছরের তুলনায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচযন্ত্রের মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে চাষাবাদের শুরুতেই উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে, ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কাও করছেন কৃষকরা। তাঁদের অভিযোগ, হাওরের পানি ধরে রাখা এবং বাঁধের ভাঙন মেরামতের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বারবার অবহিত করলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে মাটিয়ান হাওরের পূর্বপাড়ের বড়দল গ্রামে স্থানীয়দের উদ্যোগে একটি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা হাওরের পানি সংরক্ষণ ও কৃষকদের স্বার্থে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
শনি হাওরের কৃষক মাহবুব বলেন, শনি হাওরের পানি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কমে গেছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি স্লুইসগেট ও বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি বের হচ্ছে। বিষয়টি দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জানিয়েও কার্যকর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বীজতলা তৈরির শুরুতেই সেচযন্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এরপর ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে। এভাবে কৃষিকাজ করে লাভবান হওয়া কঠিন। একবার বিদেশে ছিলাম, আবারও চলে যাওয়ার কথা ভাবছি।
মাটিয়ান হাওর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর আশ্বিন মাসেই প্রায় এক মাস আগে হাওর থেকে পানি নেমে যাওয়ায় বোরো চাষাবাদে বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাধারণত ১ নভেম্বরের পর ১৬০ দিন মেয়াদি এবং ১৫ নভেম্বরের পর ১৪০ দিন মেয়াদি ধানের বীজ বপনের সময়। এর আগে বীজ বপন করা হলে বোরো ধানে চিটা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি আরও বলেন, চলতি বছর আগাম পানি নেমে যাওয়ায় কৃষকেরা বৃষ্টির অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু রোপণ উপযোগী জমি শুকিয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়েই অনেক কৃষক প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বীজ বপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, কৃষি বিভাগ থেকে সময়মতো প্রয়োজনীয় বীজ ও প্রণোদনা পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বড়দল গ্রামের বাসিন্দা, জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর ও সিলেট বিভাগীয় অঞ্চল টিমের সদস্য মাওলানা তোফায়েল আহমেদ খান বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে হাওর পরিদর্শন করে দ্রুত স্লুইসগেট বন্ধ এবং দুটি বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামতের মাধ্যমে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা না করলে কৃষকদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এতে আগামী মৌসুমের বোরো ফসল উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। মাটিয়ান হাওরের হাজারো কৃষকের মধ্যে বর্তমানে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী বলেন, হাওর থেকে যাতে নির্ধারিত সময়ের আগে স্লুইসগেট দিয়ে পানি বের হতে না পারে, সে জন্য স্লুইসগেটগুলো বন্ধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, যাতে হাওর রক্ষা বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে কোনোভাবেই পানি বের হতে না পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কৃষকেরা যাতে নির্বিঘ্নে জমিতে চাষাবাদ করতে পারেন, সে জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
হাওরপাড়ের কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, বোরো আবাদ নির্বিঘ্ন রাখতে দ্রুত হাওরের পানি সংরক্ষণ, সুইসগেট নিয়ন্ত্রণ, বাঁধের ভাঙন মেরামত এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আগাম বোরো মৌসুমেই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন হাজারো কৃষক।





