মজুরি বৈষম্যের অবসান হয়নি নারী শ্রমিকদের, নিয়োজিত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ৮:২০:১২ অপরাহ্ন

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি : চা শিল্প ও বস্তি এলাকার বেকার নারী শ্রমিকরা বৈষম্যমূলক মজুরিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে| মে দিবসকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের ৮ ঘন্টা কাজ, ৮ ঘন্টা বিনোদন আর ৮ ঘন্টা বিশ্রামের অধিকার থাকলেও জীবন আর জীবিকার তাগিদে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার নারী-পুরুষ ও বেকার শ্রমিকরা মে দিবসে অর্জিত অধিকার থেকে বঞ্চিত| মজুরিতে ˆবষম্য রোধ করার দাবি জানিয়েছেন এসব নারী শ্রমিকরা|
চা গাছ ছেঁটে ছেঁটে ২৬ ইঞ্চির বেশি বাড়তে দেয়া হয় না| চা শ্রমিকের জীবনটাও ছেঁটে দেয়া চা গাছের মতোই, লেবার লাইনের ২২২ বর্গফুটের একটা কুঁড়েঘরে বন্দি| মধ্যযুগের ভূমিদাসের মতোই চা মালিকের বাগানের সঙ্গে বাধা তার নিয়তি| চা শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম একটি বৃহৎ শিল্প| জাতীয় অর্থনীতিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে| চা বাগানের শ্রমিকরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন| প্রায় ২০০ বছর ধরে কমলগঞ্জ উপজেলার ২২টি চা বাগানে বংশ পরম্পরায় কাজ করছেন চা শ্রমিকরা| তাদের শ্রমে এই শিল্পের উন্নয়ন হলেও শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না|
নারী শ্রমিকরা জানান, ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা সেরে কাজে বের হন আর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে রান্নাবান্না করেন| এটি চা বাগানের বেকার নারীদের প্রতিদিনের চিত্র| এভাবেই চলছে তাদের জীবন সংগ্রাম| বস্তির অতি দরিদ্র ও চা শিল্পে শ্রমজীবীদের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে বেকার| এদের মধ্যে যুবতী ও মধ্য বয়সী নারী শ্রমিকরা রয়েছেন| জীবিকার তাগিদে শিল্পের বাইরে কনস্ট্রাকশন, মাটি কাটা, মাথায় টুকরি নিয়ে ইট, বালু, পাথর বহন করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত| তবে কঠিন কাজে নিয়োজিত থাকলেও মজুরি ˆবষম্য দীর্ঘদিনের| পুরুষদের সমান কাজে নিয়োজিত থাকলেও সমান মজুরি পাচ্ছেন না| মে দিবসের চেতনায় মজুরি ˆবষম্যের দাবি জানান এসব নারী শ্রমিকরা| ঝড়ে ঘরের ঢেউটিন উড়ে গেলে মালিকের অনুমতি ছাড়া মেরামত করা যাবে না| বয়সের ভারে ন্যুব্জ শ্রমিকরা অসহায়ত্ব আর উপোসে মৃত্যুর প্রহর গুণে| প্রসূতি মায়েরা চিকিৎসার অভাবে, অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত অবস্থায় সন্তান জন্ম দেন| ওই কুঁড়ে ঘরটিই তাদের সন্তান প্রসবের উত্তম স্থান, হাসপাতালের বেড তাদের জন্য সোনার হরিণ|
মৌলিক চাহিদা পূরণে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধি, ভূমি অধিকার, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি তাদের| কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা| চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের শ্রম দিয়ে চা বাগান আগলে রাখলেও তাদের শিক্ষা ও চিকিৎসা এখন সেই অবহেলিত রয়ে গেছে| সরকার তাদের আবাস্থল নিজ নিজ মালিকানায় করে দিবে বলেও এখনো এর কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না| আর এ জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভূমি নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছেন চা শ্রমিকরা| চা শ্রমিকরা জানান, বাগানের হাসপাতালে ভালো চিকিৎসার যথেষ্ট অভাব রয়েছে| বাগানে যে কয়েকটা ছোট হাসপাতাল রয়েছে তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওষুধ ও ডাক্তার না থাকায় রোগমুক্তি হচ্ছে না| অকালে ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ| তাছাড়া বাগানের কিছু কিছু ছেলে-মেয়েরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও চাকরির ক্ষেত্রে বড় কোনো পদ পাচ্ছেনা|
চা বাগানে কর্মরত নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা বর্তমানে ˆদনিক ১৮৭ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন| এর বাইরে বিপুল সংখ্যক বেকার নারী শ্রমিকরা বস্তি কিংবা শহরের বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনে, মাটি কাটা, নার্সারী, কৃষিসহ সকল ক্ষেত্রে কাজ করে সংসারের চাহিদা পূরণ করছেন| ¯^ল্প মজুরি আর বেকারত্বের কঠিন জীবন সংগ্রাম থেকে স্বস্তি পেতে তারা এসব পথ বেছে নিয়েছেন| পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে চেহারায় হাড্ডিসার দশা| জীবিকার তাগিদে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠিন কাজ করেন| রোদ, বৃষ্টিতে ভিজে, পোকা-মাকড়ের আক্রমনের মধ্যেই চলে তাদের কাজ| এরপর মজুরি! সেটিও পাঁচ সাত সদস্যের পরিবারে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল|
বস্তির নারী শ্রমিক পারভীন বেগম, শেফালি কর বলেন, পেটের দায়ে যখন যে কাজ পাই সেটা করতে আমরা বাধ্য হই| তারপরও দেড়শ কিংবা দুইশ টাকা রোজ দেয়া হয়| এটি দিয়ে সংসার চালানো কঠিন| আর পুরুষরা কাজ করলেই তিন থেকে চারশ টাকা পান| আমরাও পুরুষদের চেয়ে কাজ কম করি না| তবে পারিশ্রমিক কম পাই| তারা জানান, প্রতি বছর চা বাগানের অনেক মানুষ নিয়ে আমরা মে দিবস পালন করি| আমাদের দুঃখ-দুর্দশা সবার কাছে তুলে ধরি| কিন্তু আমাদের এই আন্দোলন কে শুনবে, কি হবে আর মে দিবস পালন করে|
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা ও কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান রাম ভজন ˆকরী জানান, চা শ্রমিকরা সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এ দেশে বাস করছে| তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযোদ্ধে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ¯^াধীন করেছিল| সেই চা শ্রমিকরা আজও অবহেলিত| বর্তমান শ্রমিক বান্ধব সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দাবি জানাচ্ছি- এই অবহেলিত চা শ্রমিকদের বাসস্থানের জায়গাটুকু যাতে তাদের নিজের নামে করে দেয়া হয়| যাতে বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের যখন তখন ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে না পারে| তিনি আরো বলেন, মজুরীবোর্ড চা বাগানের প্রতি শ্রমিকদের প্রতি অবিচার করছে| নারী শ্রমিকরা কর্মস্থলে উপযুক্ত পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে| আমরা চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী-দাওয়া নিয়ে বিগত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও সচিবদের সাথে বারবার ধর্ণা দিয়েছিলাম| বর্তমান সরকারের আমলে আমরা ˆবষম্যের অবসান চাই| আমরা চা শ্রমিকদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ আইনের সংশোধন চাই|




