কৃষকের মুখে হাসি, ঘরে উঠছে ধান
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ মে ২০২৬, ২:০০:০৭ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার: সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রাম। দুইদিক ধানি জমির বুকচিরে পিচঢালা রাস্তা চলে গেছে ঈদগাঁ বাজারের দিকে। কদিন আগে এই জমিতে দোল খাচ্ছিলো বোরোর শীষ। তবে হঠাৎ করে বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ায় শঙ্কা দেখা দিয়েছিল পানিবন্দীর। আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল ফসলহানির। তবে শেষমুহূর্তে বৃষ্টি কমে রোদের দেখা মেলায় ফসল হানির শঙ্কা কেটে যায়।
কৃষকরা দ্রুত ধান কেটে ফসল তুলতে শুরু করেন। বেশিরভাগ জমিতেই ধানকাটা শেষ। কাটা ধান জমা ও শুকানো থেকে শুরু করে বেশিরভাগ কাজ তারা করছেন জমির পাশের উঁচু জমি ও রাস্তায়। এই চিত্র কেবল দক্ষিণ সুরমার নয় সিলেট অঞ্চলের প্রতিটি ধানি জমির আশপাশ ও হাওরাঞ্চলের। ফলে কৃষকের মুখে ফুটে উঠেছে হাসি, ঘরে উঠেছে ধান। ইতিমধ্যে ৮৪ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
কৃষি সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরভুক্ত সাতটি জেলায় চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে ফসলের ক্ষয়-ক্ষতির যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে কৃষকরা স্বস্তিতে ধান ঘরে তুলছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৫৭ হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে।
তারা আরও বলে গত ৭ মে থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে প্রায় ১ হাজার ৩১৫ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত হয়েছিল, যা মোট অর্জিত জমির মাত্র ০ দশমিক ২৯ শতাংশ। পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ইতোমধ্যে ৮৪ শতাংশের বেশি ধান কাটা সম্পন্ন হওয়ায় ফলন নিয়ে অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। কৃষক ব্যস্ত ধান তুলতে।
শুধু রাজাপুর নয়, দক্ষিণ সুরমা চান্দাই, তেতলী, সদরের খাদিমনগর, খাদিমপাড়া, শিবেরবাজার, লামাকাজী, বিশ্বনাথের অলংকারী, বিয়ানীবাজারের দুবাগ, মুড়িয়া যেদিকেই এখন চোখ পড়বে দেখা মিলবে এই দৃশ্যের। ইতিমধ্যে কালবৈশাখীর পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। তাই সবার তাড়া দুর্যোগের আগেই ফসল তুলে নেওয়ার।
এতে দেখা যায় এসব এলাকার সড়ক ও আশপাশের মাঠে, বাড়ির উঠোনে, খোলা জায়গায় সবাই ব্যস্ত ধান গোছানোর কাজে। কেউ মাঠ থেকে কেটে আনা বোরো ধান কাঁধে করে নিয়ে এসেছেন, কেউ আগের সংগৃহীত ধান মাড়াই করছেন, কেউ মাড়াই করা ধান থেকে বাতাসে দুলিয়ে চিটা আলাদা করছেন। পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিশুরাও অংশ নিয়েছেন ধান সংগ্রহের এই উৎসবে। নারীরা ব্যস্ত ধান গোছানোয়, শিশুরা মাড়াইয়ের পর সংগৃহীত খড় রোদে শুকাতে।
বোরোর মৌসুম শুরু হয় আমনের মৌসুম শেষ হবার পরে। ধান রোপণ শুরু হয় বাংলা কার্তিক-অগ্রহায়ণ (অক্টোবর-নভেম্বর) মাস থেকে এবং ধান কাটা চলে বাংলা বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ (এপ্রিল-জুন) মাস পর্যন্ত। হেমন্তকালের শুরু থেকে গ্রীষ্মকালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ধানের সময় চলে এবং এই ধানের মূল ফলন বসন্তকালে হয় বলে একে বাসন্তিক ধান বলেও ডাকা হয়।
গত কয়েকদিনে সিলেটের বিভিন্ন হাওর ও গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে বেশিরভাগ মাঠেই ধানকাটা প্রায় শেষ। এখন বোরো ধান ঘরে তোলার উৎসবে মেতেছেন চাষিরা। অবশিষ্ট পাকা ধান কেটে বাড়িতে নেওয়া, মাড়াই এবং সেদ্ধ করে তা রৌদ্রে শুকিয়ে গোলায় তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নাওয়া খাওয়া ভুলে নারী-পুরুষ, ছেলে বুড়ো সবাই ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ করছেন। যত দ্রুত ধান ঘরে তোলাই আপ্রাণ চেষ্টা চাষিদের।
কেউ ধান কাটছেন কেউ ধান ঝেড়ে খড়ের মুঠি আলাদা করে স্তূপ করে রাখছেন। কেউ কেউ মাথায় ও ভার সেজে বাড়ি নিয়ে ফিরছেন। অনেকেই আবার জমির মাঝে খোলা তৈরি করে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কৃষকেরা জানান, এবারে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। মাঝখানে ফসল তলিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে তারা দুঃশ্চিন্তায় পড়েন। তবে বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় এবং পরিস্থিতি ভালো থাকায় তারা এ যাত্রায় বড়ো ক্ষতি থেকে বেঁচেছেন।





