স্বাভাবিক রূপ হারাতে বসেছে লোভা নদী
প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ মে ২০২৬, ৮:০২:০৭ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেটের সীমান্তবর্তী লোভা নদী একসময় ছিল স্বচ্ছ পানি, পাথরের সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্রের এক অনন্য আধার| বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে ফুলে-ফেঁপে ওঠা এই নদী শুধু প্রকৃতিপ্রেমী বা পর্যটকদেরই আকর্ষণ করত না, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল| কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন, ভারী যন্ত্রের ব্যবহার এবং পরিকল্পনাহীন ব্যবস্থাপনার কারণে এখন নদীটি তার স্বাভাবিক রূপ হারাতে বসেছে| জাতীয় নদী দিবস সামনে রেখে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় লুভা নদীর ভয়াবহ বাস্তবতা উঠে এসেছে| সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী সেল ‘রিপোর্টস সাসটেইনেবিলিটি’-তে প্রকাশিত ‘সোসিও-ইকোলজিক্যাল ইমপ্যাক্টস অব রিভারাইন অ্যাগ্রিগেট এক্সট্র্যাকশন অ্যান্ড পাথওয়েজ টুওয়ার্ড সাসটেইনেবল ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে লোভা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীতল, পলি পরিবহন ব্যবস্থা ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আতিকুল হকসহ দেশ-বিদেশের তিনজন গবেষক| এতে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় মানুষের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নদীর পরিবর্তন মূল্যায়ন করা হয়েছে|
গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর ভেতরে ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে যেভাবে পাথর উত্তোলন করা হয়েছে, তা নদীর স্বাভাবিক পুনর্গঠন ক্ষমতার চেয়েও বেশি ছিল| ফলে কোথাও নদীর তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর হয়েছে, কোথাও আবার পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে| এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও পলি পরিবহন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে| গবেষকরা বলছেন, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে নদীতীরের ভাঙন বেড়েছে এবং বন্যার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে|
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর পানির স্বচ্ছতা কমে গেছে এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে| নদীর ভেতরে ˆতরি হয়েছে বড় বড় গর্ত| এসব কারণে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে| নদীতীরবর্তী বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল নামলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আকস্মিক ভাঙন ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি ˆতরি হচ্ছে|
তারা বলছেন, নদীগুলোতে খননযন্ত্র ও ড্রেজার ব্যবহারের কারণে শুধু নদীতলই নয়, আশপাশের কৃষিজমি ও পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| অনেক এলাকায় নদীর তীর ধসে বসতভিটা ঝুঁকিতে পড়েছে| আবার কোথাও কোথাও নদীর স্বাভাবিক গভীরতা পরিবর্তিত হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাচ্ছে|
গবেষণায় সামাজিক বাস্তবতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে| লোভা নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত বহু শ্রমিক, নৌকাচালক ও ব্যবসায়ী পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর কর্মহীন হয়ে পড়েছেন| সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর তারা আয় হারিয়েছেন বা বেকার হয়েছেন| প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাদের আর্থিক অবস্থা আগের তুলনায় খারাপ হয়েছে|
তবে গবেষকরা মনে করছেন, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ জরুরি হলেও বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শুধু নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংকট ˆতরি করতে পারে| তাই টেকসই ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন|
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২১ সালে সরকারিভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর নদীর কিছু অংশে প্রাকৃতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে| নদীর মূল প্রবাহপথে পানির গতিশীলতা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে এবং কিছু এলাকায় পলি জমা শুরু হয়েছে| তবে নদীতীরের বড় বড় খনিগর্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত বন্যাপ্রবণ অঞ্চল এখনো আগের ক্ষত বহন করছে| গবেষকদের মতে, শুধু উত্তোলন বন্ধ করলেই নদী পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরবে না| এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম প্রয়োজন|
গবেষণায় টেকসই নদী ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে| এর মধ্যে রয়েছে নদীর সক্রিয় প্রবাহ এলাকা থেকে উত্তোলন সীমিত করা, ছোট পরিসরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলন, মৌসুমভিত্তিক উত্তোলন নীতিমালা প্রণয়ন, স্থানীয় জনগণকে ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নদীতীর ও বন্যাপ্রবণ এলাকা পুনরুদ্ধার করা|





