ছাতক-দোয়ারায় কোটি টাকার গাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রির অভিযোগ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:৪০:২৫ অপরাহ্ন

ছাতক প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সড়ক ও নদীতীরবর্তী এলাকায় বন বিভাগের আওতাধীন অসংখ্য পুরোনো গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। সড়ক প্রশস্তকরণের কথা বলে কর্তন করা এসব গাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ দরপত্রের মাধ্যমে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
সম্প্রতি সিলেট অঞ্চল বন বিভাগের দরপত্র প্রক্রিয়ায় একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরোনো গাছ কম মূল্যে বিক্রি করা হয়েছেÑএমন অভিযোগও উঠেছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
গাছ কর্তন ও নিলাম প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটি’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। অভিযোগের অনুলিপি সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক, সিলেটের বন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া হয়েছে। এতে গাছের মূল্য নির্ধারণ, নিলাম প্রক্রিয়া ও কাঠের পরিমাণ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন অংশে প্রায় দুই যুগের বেশি সময় আগে রোপণ করা রেন্টি, মেহগনি, আকাশমনি, জাম, পিটালী, অর্জুন, ছাতিয়ান, জারুল, গামার, করই, চাম্বল, বাবলা ও কদমসহ বিভিন্ন প্রজাতির শত শত গাছ রয়েছে।
গাছ ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, এসব পুরোনো গাছের প্রতিটির বাজারমূল্য ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অথচ দরপত্রের ইজারামূল্য অনুযায়ী ছোট-বড় প্রতিটি গাছের গড় মূল্য ২ থেকে ৩ হাজার টাকার মতো পড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে সরকারি রাজস্বের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বন বিভাগের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের হাসনাবাদ থেকে তাজপুর এবং তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে তিনটি লটে ৪৩৪টি গাছ কর্তনের অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়া হাসনাবাদ থেকে ছাতক পর্যন্ত আরও একটি লটে ৭০২টি গাছ কর্তনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। ইজারাকৃত এসব গাছ কর্তনের ক্ষেত্রে সাতটি শর্ত বেঁধে দিয়ে পর্যায়ক্রমে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
সিলেট অঞ্চল বন বিভাগ সর্বশেষ গত ১০ আগস্ট তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর পর্যন্ত একটি লটে ৪৩৪টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কর্তনের অনুমতি দেয়। সেখানে কাঠের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৫১০ দশমিক ২৯ ঘনফুট। এর ইজারামূল্য ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
তবে নির্ধারিত সীমানা ও শর্ত ভঙ্গ করে গাছ কর্তন ও পরিবহনের অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের অনুমতিপত্রে তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর পর্যন্ত এলাকায় গাছ কর্তনের কথা উল্লেখ থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, তাজপুর থেকে গোবিন্দগঞ্জ পর্যন্তও গাছ কাটা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কর্তন করা বেশির ভাগ পুরোনো গাছের বাজারমূল্য ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, গাছের মোট পাঁচটি লটের মধ্যে চারটির সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছেন সুনামগঞ্জের সুমন আহমদ নামে এক ঠিকাদার। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই চার লটের গাছ কর্তন করেছেন। অন্যদিকে হাসনাবাদ থেকে ছাতক পর্যন্ত ৭০২টি গাছের লটের সর্বোচ্চ দরদাতার বিষয়ে স্থানীয় বন বিভাগে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে গিয়ে কর্তন করা গাছের গুঁড়ি ও অবশিষ্ট গাছ গুনে প্রকৃতপক্ষে কতটি গাছ কাটা হয়েছে, তা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান গাছের সংখ্যা এবং কাগজপত্রে উল্লেখিত সংখ্যার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, কর্তন করা গাছের প্রকৃত সংখ্যা, প্রজাতি, বয়স ও বাজারমূল্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে সরকারি রাজস্বের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে প্রায় ২৫ বছর বয়সী মূল্যবান গাছ নামমাত্র মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে কি না, নির্ধারিত সীমানার বাইরে কোনো গাছ কাটা হয়েছে কি না, কাগজপত্রে উল্লেখিত গাছের সংখ্যার সঙ্গে বাস্তবে কাটা গাছের সংখ্যা মিলছে কি না এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি নাÑএসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ছাতকের পাশাপাশি দোয়ারাবাজার উপজেলার কারুলগাঁও থেকে বেতুরা সড়কেও একইভাবে গাছ কর্তনের অভিযোগ উঠেছে। সেখানে দুটি লটে মোট ৮৫টি গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কাঠের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৩৪ দশমিক ৭০ ঘনফুট এবং এর ইজারামূল্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫০ টাকা।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সড়ক প্রশস্ত করার কাজের জন্য গাছগুলো কাটার প্রয়োজন হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, গাছ কাটার অনেক আগেই ওই সড়কের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ফলে সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
ছাতক উপজেলায় কর্মরত বন কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস বলেন, কাগজে ভুল লেখা হয়েছে। মার্কিং মূলত গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্ট পর্যন্তই। গাছ কর্তনের শর্ত ভঙ্গ করা হলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দোয়ারাবাজারে গাছ কর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, মূলত ওয়ার্ক অর্ডার পেতে দেরি হওয়ায় রাস্তার কাজ আগেই সম্পন্ন করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা বন কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, তিনি জেলায় যোগদানের আগেই এসব গাছ কর্তনের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। গাছের মূল্য নির্ধারণে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এসব গাছ নিলামের আগে নিয়ম অনুযায়ী আমাদের একটি কমিটি গাছের মূল্য নির্ধারণ করেছে। এরপর সর্বোচ্চ দরদাতাকেই গাছ কর্তনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও বন বিভাগের বক্তব্যে গাছের বাজারমূল্য, নির্ধারিত কাঠের পরিমাণ, ইজারামূল্য এবং কর্তনের সীমানা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন সামনে এসেছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে সরকারের কত রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল এবং কত টাকায় গাছগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছেÑতা নির্ধারণে নথিপত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি লটে গাছের সংখ্যা, প্রজাতি, বয়স, কাঠের পরিমাণ ও বাজারমূল্য পুনর্মূল্যায়ন করা হোক। একই সঙ্গে অনুমোদিত সীমানার বাইরে গাছ কর্তন হয়েছে কি না এবং দরপত্র প্রক্রিয়া বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা স্পষ্ট হবে।
তাঁদের মতে, সরকারি সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় গাছ কর্তন ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে সরকারি রাজস্বের সম্ভাব্য ক্ষতিও রোধ করা সম্ভব হবে।







