রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি জট : পিছিয়ে যাচ্ছে উৎপাদন
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:২৭:১৬ অপরাহ্ন
আকাশসীমা ব্যবহারে ভারতের আপত্তি, বিকল্প ভাবছে রাশিয়া

জালালাবাদ রিপোর্ট : দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশে আসতে পারেনি। রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানি বহনকারী বিশেষ কার্গো ফ্লাইটের ঢাকায় আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত রুটে একটি দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না মেলায় এ জটিলতা তৈরি হয়েছে। এদিকে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনও সেফটি ভালভের ত্রুটিতে আটকে থাকায় রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ পাওয়ার সময় আরও পিছিয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাশিয়া থেকে জ্বালানি বহনকারী বিশেষ কার্গো ফ্লাইটটির ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। এর জন্য বাংলাদেশ ও রাশিয়া প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রসাটমের পক্ষ থেকে জ্বালানি পাঠাতে দেরি হওয়ার কথা জানানো হয়। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে জটিলতার কারণেই নির্ধারিত ফ্লাইটটি আসতে পারেনি।
রাশিয়া থেকে এ ধরনের চার্টার্ড বিমান সাধারণত কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রাশিয়া থেকে উড্ডয়নের পর বিমানটি ভারতে যাত্রাবিরতি করে জ্বালানি সংগ্রহ করে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। এবারও একই রুট ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। তবে ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি-সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে সূত্রের আভাস। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কিংবা প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।
পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমতির পাশাপাশি যেসব দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করা হবে, সেসব দেশের অনুমতিও প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, এধরনের পরিবহনে ‘নিউক্লিয়ার ডিপ্লোম্যাসি’ গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কোনো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক সমন্বয়ে সমস্যা হলে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি পেতে বিলম্ব হতে পারে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি প্রথমে গত জুনে আসার কথা ছিল। পরে দুদফা সময় পেছানোর পর গত ২৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত উড়োজাহাজে জ্বালানি লোডও করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ সময়ে সেটি পাঠানো সম্ভব হয়নি। তবে এ বিলম্বে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ তাৎক্ষণিকভাবে থেমে যাবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কারণ দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোড করার আগে আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে।
তবে জ্বালানি সরবরাহের এই জটিলতার সঙ্গে রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার সময় নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রথম ইউনিটের জ্বালানি ইতোমধ্যে লোড করা হলেও সেফটি ভালভে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হয়নি। চলতি মাসে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা থাকলেও সেই সময়সীমা পার হয়ে গেছে। ত্রুটি মেরামতে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল এসেছে এবং প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রাংশও আনা হয়েছে। মেরামত শেষ করে কবে নাগাদ প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
আকাশপথের জটিলতা এড়াতে রাশিয়া এখন বিকল্প রুটে জ্বালানি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। সম্ভাব্য রুট হিসেবে চীন ও মিয়ানমারের পথ বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন রুটে জ্বালানি আসবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অনুমতি, উড়োজাহাজ চলাচলের সুযোগ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী মাসে আবার জ্বালানি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে রসাটম। সাতটি ফ্লাইটে ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ১৬৩টি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটের পাশাপাশি প্রথম ইউনিটের জন্যও কিছু জ্বালানি থাকবে। প্রথম ইউনিটে লোড করা জ্বালানির প্রায় এক-চতুর্থাংশ দেড় বছর পর পরিবর্তন করতে হবে। এ কারণে আগেভাগেই অতিরিক্ত জ্বালানি আনা হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া প্রথম তিন বছর রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহ করবে। এরপর নির্দিষ্ট সময় পরপর জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে এবং তখন বাংলাদেশকে তা আমদানি করতে হবে। ফলে ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানি, ব্যবহৃত জ্বালানি বা পারমাণবিক বর্জ্য রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক আকাশপথ ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অনুমতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সময়সীমা ইতোমধ্যে পিছিয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহেও দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা। ফলে রূপপুরের পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
এদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সারাদেশের মতো সিলেটেও বেড়েছে লোডশেডিং। এমন পরিস্থিতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন শুরু পিছিয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ যুক্ত হবে না। ফলে চলমান বিদ্যুৎ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।





