চতুর্মুখী সংকটে বাংলাদেশ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৭:২৭:৪৫ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট: মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে বহুমুখী সংকটের ঝুঁকিতে পড়ছে বাংলাদেশ| জ্বালানি সরবরাহ ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি থেকে শুরু করে উৎপাদন, রপ্তানি ও বিনিয়োগে বাড়তি চাপ ˆতরি হয়েছে| একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ায় উদ্বেগ ˆতরি হয়েছে প্রবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স নিয়ে| এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসা এবং গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে ওঠার আশঙ্কা অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে তুলেছে| সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব চাপ আরও তীব্র হয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটের মুখে ফেলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন|
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার পাশাপাশি সৌদি-হুথি সংঘাতের ফলে সুয়েজ খাল ও বাব এল-মান্দেব দিয়ে আমদানি ও রপ্তানিতে বড় শঙ্কা ˆতরি হয়েছে| যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হলে সেখানে থাকা বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর চাকরি ও ব্যবসা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে| ফলে প্রবাসী কর্মীদের আয় ও অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে| তবে সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্স কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের ব্যাপ্তি, স্থায়িত্বের ওপর| তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে| জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে| এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ˆতরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে| এখন উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে| সংঘাত তীব্র হলে রেমিট্যান্স, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ ˆতরি হয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলতে পারে|
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আমাদের এক মহাসংকটে ফেলে দিয়েছে| মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে| এ অবস্থায় আমদানি কমে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে| যার প্রভাব পড়ছে প্রবৃদ্ধি থেকে মূল্যস্ফীতি সর্বক্ষেত্রে| সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিও সংকটে পড়ছে| যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সেদেশে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি ও আয়ের ওপর|
সংকট উত্তোরণে আবু আহমেদ বলেন, আইএমএফ আমাদের সুদ বাড়ানোসহ বিভিন্ন ধরনের প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে| কিন্তু আমাদের সব কিছু মানা যাবে না| সুদের হার না বাড়িয়ে বরং কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে| সরকারের বিলাসী ব্যয়ের পাশাপাশি কম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে|
এদিকে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমছে| বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে| গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে| ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন-ঘাটতি| উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা|
সরকারি সূত্র বলছে, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ˆবদেশিক শ্রমবাজার| বর্তমানে দেশটিতে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত| চলতি বছর প্রথম আট মাসে সৌদি আরবে গেছেন ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন| এ ছাড়া বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ৭০ হাজার ৩০৪ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন| এর মধ্যে ৩২ হাজার ৯১৫ জন গন্তব্য ছিল সৌদি আরব| দেশটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্সের উৎস| বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে| আর গত আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৫ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার| এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার| রেমিট্যান্সের প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে| ফলে দেশটিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা ˆতরি হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের ওপর পড়তে পারে|
সরকারি হিসাব বলছে, বাংলাদেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন| এর মধ্যে ১৪-১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়| সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সৌদি আরামকো থেকে ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ আসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন| এর বাইরে আবুধাবির অ্যাডনক থেকেও অপরিশোধিত তেল কেনে বাংলাদেশ| এ অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, বিটুমিন, পেট্রলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন হয়| সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মধ্যে সারও রয়েছে| দেশটি থেকে ইউরিয়া আমদানি করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং ডিএপি আমদানি করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)| এ যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে আমদানি প্রক্রিয়ায় বাধা ˆতরি হতে পারে|
সমস্যা থেকে উত্তরণে বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরানো, জ্বালানিনিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কর-রাজ¯^ বাড়ানোকে সংস্কারের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে| পাশাপাশি সাধারণ ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে|





