শ্রমিক বিক্ষোভে তিন শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ২:০১:৩৬ অপরাহ্ন
আ. লীগের নেতাকর্মীদের উসকানির দাবি পুলিশের
পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক

জালালাবাদ ডেস্ক: ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ ও কালো তালিকাভুক্তি বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কর্মবিরতিতে অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের প্রধান তৈরি পোশাকশিল্পাঞ্চল। রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিকদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগও করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব শিল্পাঞ্চলের তিন শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সরকার ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করে জরুরি আলোচনায় অংশ নেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সন্ধ্যা ৬টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রবিবার রাত ৯ টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৈঠক চলছিল।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, শ্রমিকদের স্বাভাবিক আন্দোলনের আড়ালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সহিংসতায় উসকানি দিয়েছেন। এ ঘটনায় মিরপুর থেকে ১১ জন এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের ৯ জনসহ মোট ২০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
শ্রমিক আন্দোলনে উসকানির অভিযোগ, গ্রেপ্তার ২০:
গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, পোশাকশ্রমিকদের সাধারণ আন্দোলনের আড়ালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মী পেছন থেকে উসকানি দিচ্ছিলেন। যানবাহনে আগুন দেওয়া, ভাঙচুর ও নাশকতার মাধ্যমে আন্দোলনকে সহিংস রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের।
এ ঘটনায় মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লাসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী। তাঁদের মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধার বাসিন্দা রয়েছেন। মিরপুর-১২ নম্বরের মোল্লা মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মী পেছন থেকে উসকানি দিচ্ছিলেন। যানবাহনে আগুন দেওয়া ও নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁরা মাঠে সক্রিয় ছিলেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফুটেজে গেরিলা-৭১, ধানমন্ডি ৩২-সহ বিভিন্ন স্থানের কার্যক্রমের চিত্র পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছে ডিবি।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা স্থানীয় পোশাক কারখানার শ্রমিক নন। শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার উদ্দেশ্যে তাঁরা মিরপুরে জড়ো হয়েছিলেন। এ চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও বিক্ষোভে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। সেখানে ছাত্রলীগের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সাজমুল ইসলামকে একটি মিছিলের নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের আরও ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মিরপুরে সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন:
রবিবার সকাল থেকে মিরপুরের ১০, ১১ ও ১২ নম্বর সেকশনসহ আশপাশের কয়েকটি মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেন আন্দোলনকারীরা। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন।
পরিস্থিতির কারণে মিরপুর ১০, মিরপুর ১১ ও পল্লবী মেট্রোস্টেশন দুপুর ১২টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মিরপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ২০ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
গাজীপুরে ছয় ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ:
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সকাল ৯টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও অবরোধ শুরু করেন পোশাকশ্রমিকরা। এ সময় সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় ছয় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। বেলা ৩টার পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এ ছাড়া সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিকরা। দুপুরের পর পরিস্থিতির অবনতি হলে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি বিজিবিকেও মাঠে নামানো হয়।
তিন শতাধিক কারখানায় ছুটি:
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তার কারণে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৭৭টি তৈরি পোশাক কারখানায় রবিবারের জন্য ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত শতাধিক কারখানাও বন্ধ ছিল। এ ছাড়া সাভারের বিভিন্ন এলাকায় আরও অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। সব মিলিয়ে তিন শতাধিক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ বা ব্যাহত হয়।
শিল্প পুলিশ-১-এর আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সকাল থেকেই পোশাকশ্রমিকরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করছেন। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে নিরাপত্তার স্বার্থে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ১৭৭টি কারখানায় এক দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। কারখানাগুলোর সামনে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
অন্যদিকে শিল্প পুলিশ-২-এর গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত শতাধিক কারখানা বন্ধ ছিল। অন্য কারখানাগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। সোমবার থেকে সব কারখানা খুলবে এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড:
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রবিবার দুপুরে সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। বোর্ডটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব মো. আসিফ আইয়ুব এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেনকে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বোর্ডে রয়েছেন।
এর আগে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ডের সভা করে শ্রমিকদের মজুরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর আশ্বাস দেয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক:
শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।
মজুরি বোর্ড গঠন এবং শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বানের পরও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের মজুরি ও চাকরির নিরাপত্তার দাবি, অন্যদিকে আন্দোলনের মধ্যে নাশকতা ও সহিংসতার অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।





