চার চাকার শয়তান-এর দৌরাত্ম্য!
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ মে ২০২৩, ৫:৩০:৪৭ অপরাহ্ন
যান্ত্রিক গাড়ি আবিষ্কৃত অর্থাৎ তৈরি হওয়ার পর অনেক বিদগ্ধজন এটাকে ‘চার চাজার শয়তান’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের অভিমত ছিলো, যান্ত্রিক গাড়ি দুর্ঘটনার কারণ হবে, মানুষকে হতাহত করবে। যান্ত্রিক গাড়ি অর্থা মোটরগাড়ি আবিষ্কার বা চালুর পর ইতোমধ্যে প্রায় পৌনে তিনশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে এবং বাষ্পীয় ইঞ্জিন থেকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে চালিত ইঞ্জিনে বিবর্তিত হয়েছে গাড়ির ইঞ্জিন। যান্ত্রিক গাড়ি আবিষ্কারের পর এই দীর্ঘ সময়ে যেমন লাখ লাখ সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং কোটি মানুষ হতাহত হয়েছেন, তেমনি এই দুর্ঘটনা হ্রাস ও নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ও থেমে নেই। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি
উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো অগণিত মোটরগাড়ি চলাচল করছে। দুর্ঘটনাও ঘটছে প্রায় প্রতিদিন। কিন্তু সুষ্ঠু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ফলে উন্নত দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনাও এতে হতাহতের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। কিন্তু এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে এখন প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়, আহত হচ্ছেন এর চেয়ে অনেক বেশি। বছরে এই সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৭ হাজারেরও বেশি। পাশ্চাত্যের উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থা ও অত্যাধুনিক রোড নেটওয়ার্ক সম্বলিত দেশগুলোতে এতো বিপুল সংখ্যক মোটর গাড়ি চলাচল করলেও এমনকি অনেক দেশে জনসংখ্যার তুলনায় বেশি গাড়ি চলাচল করলেও যে সব দেশে বাংলাদেশের তুলনায় সড়ক দুর্ঘনার হার অনেক কম। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমার পরিবর্তে দিন দিন বেড়েই চলেছে, বেড়ে চলেছে হতাহতের সংখ্যা। এতে পঙ্গু হয়ে সংসারের বোঝায় পরিণত হচ্ছে বহু লোক।
বলা যায়, যান্ত্রিক চার চাকার গাড়ি আবিষ্কারে অনেক সচেতন মানুষ এটা নিয়ে যে আশংকা প্রকাশ করেছিলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন তা সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। মোটরগাড়ির ত্রুটি বিচ্যুতি যথেষ্টভাবে দূর করতে না পারা, সুষ্ঠু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থতার কারণে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এতো পিছিয়ে পড়েছে, এদেশে এতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি বেপরোয়া যানবাহন চালকদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও তার প্রয়োগ না থাকার কারণে দুর্ঘটনা এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।
গত বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সিএনজি অটোরিকশার ধাক্কায় সেনাবাহিনীর একজন সদস্য মারা যান। ঐ দিন রাতে কমলগঞ্জ থানার এসআই পবিত্র শেখর দাসের নেতৃত্বে কমলগঞ্জ থানা পুলিশের একটি টিম রাজনগর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সিএনজি দুর্ঘটনা সংঘটনকারী সিএনজি অটোরিকশা উদ্ধার ও আটক করেন এবং এর চালককে গ্রেফতার করেন। এভাবে ত্বরিৎ গতিতে দুর্ঘটনা সংগটনকারী গাড়ি ও চালককে খুঁজে বের করে আটক ও গ্রেফতারের ঘটনাটি ইতোমধ্যে অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বিষয় অনেকের নজর এড়িয়ে যায়নি। সেটা হচ্ছে, গত শুক্রবার হবিগঞ্জে একটি দ্রুতগামী গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান একজন সিএনজি অটোরিকশা চালক। কিন্তু এক্ষেত্রে পুলিশ এ পর্যন্ত তেমন কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথা শোনা যায়নি। দুর্ঘটনা সংঘটনকারী গাড়িকে যেমন আটক করা যায়নি, তেমনি এর চালককেও গ্রেফতার করা হয়নি বা যায়নি। সেনা সদস্য নিহত হওয়ার পর পুলিশ যেভাবে তৎপর হয়ে ওঠেছিলো সেটা লক্ষ্য করা যায়নি হতভাগ্য সিএনজি চালকের প্রাণহানির ক্ষেত্রে। অথচ পুলিশ যে দুর্ঘটনা সংঘটনকারী গাড়ি ও এর চালককে দ্রুত খুঁজে বের করতে সক্ষম, তা প্রমাণিত দুর্ঘটনায় সেনা সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায়।
প্রকৃতপক্ষে সড়ক দুর্ঘটনার দায়ী গাড়ি ও চালকদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে দিন দিন এদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির এটাও যে একটি অন্যতম কারণ, এতে কোন সন্দেহ নেই। আমরা ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ নিদেনপক্ষে নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ট্রাফিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের প্রতি আবারো আহ্বান জানাচ্ছি। এ নিয়ে প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন সংবাদ ও গণমাধ্যমে লেখালেখি এবং প্রতিবেদন প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে। তাই বিষয়টিকে আর অবহেলা না করে নিরীহ পথচারী, যাত্রী ও জনগণের প্রাণ রক্ষার্থে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি।




