সিলেট হতে পারে ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ জুন ২০২৬, ১২:৪৩:৩১ অপরাহ্ন
সম্প্রতি মিডিয়ায় ‘পর্যটকদের আগমনে মুখর সাদাপাথর’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এবারের ঈদুল আজহায় পর্যটকদের পদচারণায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠা পর্যটনস্থল সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর এলাকা সম্পর্কে বলা হয়েছে এই সংবাদে। এতে বলা হয়েছে, এলাকাটি মনোমুগ্ধকর এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এখানে সুযোগ সুবিধা আরো বাড়ানো দরকার পর্যটক-দর্শনার্থীদের জন্য। এখানে ভেজা কাপড় পরিবর্তনের বুথ মাত্র ২/৩টি। এতো বিপুল সংখ্যক পর্যটকের জন্য তা নিতান্ত নগন্য। এখানে লাইফ জ্যাকেট কিংবা টিউবও নেই, যেগুলো থাকা নিরাপত্তার জন্য জরুরী। এখানে রিসোর্ট বা হোটেলের সংখ্যাও অপর্যাপ্ত। ফলে এবার অনেক পর্যটক যোগাযোগ করেও বুকিং করতে পারেননি। সবেধন নীলমনি সাদাপাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে সব রুম বুকড্ হয়ে গিয়েছিলো আগেভাগেই।
যা-ই হোক সিলেটের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র ও এলাকাগুলোতে এবার ঈদে প্রচুর ভিড় ছিলো, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। দেশের পর্যটন শিল্পের জন্য এটা যে একটি সুখবর, এতে কোন সন্দেহ নেই। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত জেলাগুলোতে পর্যটক ও দর্শনার্থী আকর্ষণের অজস্র উপাদান রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেগুলোর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, বিউটিফিকেশন এবং যোগাযোগসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির দিকে তেমন নজর নেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের। অথচ বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ ব্যয় করে, এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশী বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ব্যবস্থা করেছে। মরুভূমির দেশ সৌদিআরবে পর্যটন শিল্পকে যে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রকৃতির অবারিত দানে ভরপুর বাংলাদেশে এর সিকিভাগ গুরুত্ব ও অর্থ ব্যয় বা বিনিয়োগ করা হচ্ছে না। এদিক দিয়ে অবহেলার জ্বলন্ত উদাহরণ সিলেট বিভাগ। এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ‘সিলেট ঃ প্রকৃতির কোলে পর্যটনের সম্ভাবনা ও দায়িত্ব’ শীর্ষক একটি লেখায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সিলেট মানেই চা বাগানের গালিচায় মোড়া পাহাড়, মেঘ ছুঁয়ে থাকা ঝর্ণা, আর জাফলংয়ের স্বচ্ছ পানির গান।
দুটি পাতা এক কুঁড়ির দেশ, হযরত শাহজালালের পূণ্যভূমি, প্রবাসী প্রাণের শেকড়—এই সবকিছু মিলেই সিলেট বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে এক অনন্য নাম। কিন্তু সম্ভাবনা যতো বড়ো, তার সদ্ব্যবহার ও দায়িত্ববোধ ততোটাই গুরুত্বপূর্ণ। আজ সিলেটে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক আসেন। রাতারগুল জলাবন, বিছনাকান্দি, পান্তুমাই, লালাখাল, ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর-প্রতিটি জায়গাই একেকটি জীবন্ত পোস্ট কার্ড। সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই সৌন্দর্যকে দেখি শুধু ছবি তোলার উপকরণ হিসেবে, রক্ষা করার আমানত হিসেবে নয়। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলে এসে আমরা প্রকৃতিকে কলুষিত করছি। যে ঝর্ণার পানি এক সময় পান করা যেতো, আজ তার রং বদলায়। পর্যটন শুধু দেখার বিষয় নয়, এটি অর্থনীতির চালিকাশক্তিও বটে। সিলেটের চা বাগান, পাথর কোয়ারি, হাওরের মাছ, মনিপুরী তাঁত, শীতলপাটি-সবকিছুই পর্যটনের সঙ্গে জড়িয়ে আয়ের উৎস হতে পারে। স্থানীয় মানুষ যদি সরাসরি গাইড হোমস্টে, হস্তশিল্প আর স্থানীয় খাবারের মাধ্যমে উপকৃত হন, তবেই পর্যটন টেকসই হয়।
সরকারের কাজ হলো অবকাঠামো ঠিক করা-রাস্তা, বিশ্রামাগার, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে বেসরকারী উদ্যোগ ও জনগণেরও দায়িত্ব আছে। পর্যটনকেন্দ্র ও পর্যটন এলাকার প্রকৃতিকে অটুট-অক্ষত এবং এর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে স্থানীয় জনগণ এবং পর্যটক-দর্শনার্থীদের। এক্ষেত্রে কোন অবহেলা কাম্য নয়। এতে আরো বলা হয়েছে, সিলেট অঞ্চল যদি প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও দায়িত্বশীলতার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, তবে এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার একটি সেরা ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য হয়ে ওঠতে সক্ষম হবে। আমরা এদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি ও মনোযোগ প্রত্যাশা করি।




