দুষ্ট চক্রে বন্দী জনগণ
প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ মে ২০২৩, ১২:৩০:৫৭ অপরাহ্ন

অসৎ সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং নেতানেত্রীদের অপকর্মের কারণে বাংলাদেশের মানুষের জীবন এখন দুর্বিসহ হয়ে ওঠেছে। সবখানেই এই অসাধু লোকজনের নখর বিস্তৃত। যারা দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে কাজ করতে চায় তারাও এদের ভয়ংকর থাবা থেকে নিরাপদ নয়। সম্প্রতি একটি জাতীয় অনলাইন পত্রিকায় ‘২১ হাজার টাকা বেতনের ভিসা কেন ৭ লাখ টাকা?’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী দেশ কুয়েত। জীবন জীবিকার তাগিদে ছুটে যাওয়া দেশটিতে এখন আড়াই লাখেরও বেশি বাংলাদেশীর বসবাস। তাদের বেশির ভাগই আকুদ আকামাধারী ভিসায় (সরকারি প্রজেক্ট) পাড়ি জমিয়েছেন। প্রবাসে যাওয়ার আগে খুব কম সংখ্যক মানুষ আখুদ ভিসা সম্পর্কে ধারণা রাখেন। অধিকাংশই ক্লিনার কোম্পানীতে কাজ করেন, যাদের বেতন মাত্র ৭৫ দিনার। বাংলাদেশী অর্থে টাকার পরিমাণ মাত্র ২১ হাজার। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে কুয়েতের একটি ক্লিনিং কোম্পানীতে কাজ করতে যান জনৈক বাংলাদেশী যুবক। জানতেন না তিনি আসলে কী ভিসায় গেছেন সেখানে। দালালের ফাঁদে পড়ে ঋণ নিয়ে তার প্রবাস যাত্রা।
দেখা গেছে, ক্লিনার ভিসাতে যারা যান তাদের বেশির ভাগই পার্ট টাইম কাজ করেন। যারা এই পার্ট টাইমের সুযোগ পান না তাদেরকে বছরের পর বছর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলতে হয়। নিজের শখ পূরণ দূরে থাক, পরিবারের চাহিদাও ঠিকমতো পূরণ করতে পারেন না। এই প্রবাসীর অভিযোগ, কোনো বাংলাদেশ থেকে কুয়েত যেতে তাদের ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হবে? যেখানে কি-না ভারতীয় ও নেপালিরা যান মাত্র ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে খরচ করে। কুয়েতে কোম্পানীগুলো নাম মাত্র টাকা দিয়ে ভিসা দেয়। বাংলাদেশীদের জন্য সেই ভিসার দাম হয়ে যায় ৭ লাখ টাকা। প্রবাসীদের অভিযোগ, বাকী সব টাকা যায় দালালের পকেটে। অথচ সরকারের এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেই।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কুয়েতের সরকারীভাবে বাংলাদেশীদের জন্য সব ভিসা বন্ধ। লামানা পদ্ধতি ছাড়া ভিসা বের করা সম্ভব হয় না। সেখানে বাংলাদেশীদের ভিসা বের করার জন্য মন্ত্রী বরাবর দরখাস্ত করতে হয়। তা-ও আবার দালালদের মাধ্যমে। এভাবে ভিসার দাম ৭ থেকে ১০ লাখ টাকায় পৌঁছায়। এছাড়া সম্প্রতি কুয়েতের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে ১৯০ দিনার বেতনে ভারত থেকে কর্মী নিয়েছে। তাদের ভিসা একদম ফ্রি। শুধু নামমাত্র খরচ হয়। অথচ বাংলাদেশীদের জন্য একই কাজে বেতনে মাত্র ৭৫ দিনার।
বলা হয়, প্রবাসী আয় বা তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। কিন্তু প্রবাসীদের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহের আচরণ যে কতোটা নির্মম, তা উপরের উদাহরণ থেকে প্রতীয়মান। কুয়েত যেতে লামানার মাধ্যমে ভিসা বের করতে গিয়ে নেতামন্ত্রী ও দালালদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ দিতে হচ্ছে। এভাবে মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণের শিকার এদেশের সিংহ ভাগ মানুষ। যে পিয়াজ ভারত থেকে ২০ টাকা কেজি দরে কেনা হয়, তা এদেশে বিক্রি হয় ৮০/৯০ টাকায়। যে চাল প্রতিবেশি ভারত, বার্মা, ভিয়েতনামে প্রতি কেজি ৪০/৪৫ টাকায় বেশি নয়, তা বাংলাদেশে ৮০/৮৫ টাকা।
কথা হচ্ছে, অধিকাংশ ব্যবসায়ী আমদানীকারকই লোভী। তাদের লক্ষ্য যতো বেশি সম্ভব মুনাফা অর্জন। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারের এই বিভাগ ও সংস্থাগুলো হাত মিলিয়েছে লোভী মুনাফাখোর আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও মজুতদারদের সাথে। অনেক ক্ষেত্রে নেতামন্ত্রীরা মজুতদার ও মুনাফাখোরদের ভূমিকায় অবতীর্ণ। ফলে জনগণ হয়ে পড়েছে নিতান্ত অসহায়। কর্তৃপক্ষ ও অসৎ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট মধ্যস্বত্বভোগীদের এই ফাঁদ থেকে তারা কোনভাবেই বের হতে পারছে না। গৃহস্থের কুকুর ও বনের লোভী শেয়ালের সাথে বন্ধুত্ব হলে, গৃহস্থের যে দশা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হয়েছে এই দশা। কে করবে তাদের উদ্ধার, কীভাবে পাবে তারা মুক্তি, এই মরণ ফাঁদ থেকে, এমন প্রশ্নে এখন তোলপাড় দেশের সাধারণ মানুষের জীবন।



