পানি আগ্রাসনের কবলে দেশ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৫:৩৮ অপরাহ্ন

গতকাল মিডিয়ায় ‘শুধু তিস্তা নয়, ধরলার পানিও প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ভারতের’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তিস্তা প্রকল্প যখন এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির একটি বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে তখন ধরলার পানি প্রত্যাহারের বিষয়টিও যে এই জটিলতাকে আরো বৃদ্ধি করবে এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু তিস্তাই নয়, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে ধরলা নদীর পানিও প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে ভারত।
গবেষকদের মতে, এতে উত্তরের ৫০টিরও বেশী শাখা ও উপনদী পানিশূন্য হয়ে পড়বে। এটি সরকারি কৃষি ও জীববৈচিত্রে প্রভাব ফেলবে। অধিকারকর্মীরা বলেছেন, বাংলাদেশের উত্তরের বিশাল জনগোষ্ঠীকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষায় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে পানির অধিকার নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
বলা বাহুল্য, ২০১১ সালের ভারত-বাংলাদেশ অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা চুক্তির কোন ধারাই মানছে না উজানের দেশ ভারত। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে ঝুলে থাকা তিস্তাচুক্তিও আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৪ সাল থেকে তিস্তার পানি একতরফা প্রত্যাহার করছে দেশটি। একদিকে পানির ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রাসী নীতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে উজানে খাল খনন ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু তিস্তাই নয়, ধরলা নদীর পানিও সরানোর উদ্যোগ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, তিস্তা ও ধরলার পানি প্রত্যাহার করা হলে উত্তরের অন্ততঃ অর্ধশতাধিক নদী পানিশূন্য হয়ে পড়বে। এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে এদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর। রিভারাইন পিপলের পরিচালক ডঃ তুহিন ওয়াদুদ বলেন, আমরা যে তিস্তা নিয়ে কথা বলছি, এখানে থেমে থাকলে হবে না। এতে ধরলা ও তিস্তার মধ্যবর্তী আরো অনেক নদী ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর এর দায় ভারত সরকারকেই নিতে হবে। বর্ষায় গজলডোবার সব গেইট খুলে দেয়ায় মৌসুমী বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে উত্তরের বিস্তীর্ণ জনপদ ভাঙছে। বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা। প্রতি বছর তিস্তার ভাঙনে অন্ততঃ ১ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। আর তিস্তা সংস্কার না করায় বর্ষায় পানির মাত্র ৮ শতাংশ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে। ‘তিস্তা বাঁচাও’ আন্দোলনের সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে শাখা প্রশাখা সহ উপ-নদীগুলো সচল হবে। আর বর্ষার পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভারত ও চীন সফরকে ঘিরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে যে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ চলছে তথা জটিলতা ও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে, সেই প্রতিকূলতা অতিক্রম করে প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নে হলেও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরী বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
কথা হচ্ছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের সাথে যে সমঝোতা হয়েছিল বাংলাদেশের, তাতে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত। শুধু পানি প্রত্যাহারই নয়, বাংলাদেশের প্রাণ বাঁচাতে নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনায়ও বাগড়া দিচ্ছে ভারত। তার কালো হাত সম্প্রসারিত করেছে এদিকে। চীন বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় জড়িত হলে তাদের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে, এমন অজুহাত দেখিয়ে এই প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারকে চীনের সহায়তা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এই আগ্রাসী প্রতিবেশী দেশটি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের হয়েছে ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ অবস্থা। ভারতের কথা শুনতে গিয়ে এখন চীনের বৈরীতে পরিণত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের। আর চীন নারাজ হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে টাকা দেবে কে? বাংলাদেশের তো নিজস্ব সামর্থ্য নেই তা বাস্তবায়নের। আর ভারত স্বার্থপর প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ থেকে শুধু নিয়েই যাচ্ছে, দেয়ার ক্ষেত্রে নেই। বাংলাদেশকে আর্থিক সহায়তা দানকারী ১০টি দেশের মধ্যে ভারতের নাম নেই।
যা-ই হোক, চীনের পরিবর্তে ভারতকে বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দেয়া হচ্ছে, এমন কথা চাউর হওয়ার পর চীন রীতিমতো ক্ষেপে গেছে। এর প্রমাণ চীনের প্রতিশ্রুত ৫-৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পেতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এর প্রভাবে চীনের সহায়তার পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনাও লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের এ মুহূর্তে এতো অর্থ বিনিয়োগ করা যেমন অসম্ভব তেমনি ভারত থেকেও কোন আর্থিক সহায়তা পাওয়া দুরাশা মাত্র, এমন অভিমত বিশ্লেষকদের।
সর্বোপরি, পানি সংকট নিয়ে বিশেষভাবে তিস্তার পানি প্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশ যে মহাসংকটে আছে এতে কোন সন্দেহ নেই। এর সাথে নতুনভাবে যুক্ত হতে চলেছে ভারত কর্তৃক ধরলা নদীর পানির একতরফা প্রত্যাহারের বিষয়টি। এসব সংকটের মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের আপামর জনগণের সমর্থনপুষ্ট একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকার। অন্যথায় পানি সন্ত্রাসী আগ্রাসী ভারতের বশংবদ ও তাঁবেদার কোন গোষ্ঠী বা কর্তৃপক্ষের এই সমস্যার কোন কার্যকর সমাধান যে অসম্ভব, এতে কোন সন্দেহ নেই।




