চাকরী পেতে রাজনৈতিক পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ জুলাই ২০২৫, ১২:৩০:৩০ অপরাহ্ন

চাকরীতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার বিধান বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এদেশের জনগণের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হরণে বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার চাকরী ক্ষেত্রে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় অনুসন্ধান বাধ্যতামূলক শর্তে পরিণত করেছিলো।
দেখা গেছে, যেসব প্রার্থীর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, তাদেরকে সরকারী চাকরীতে নিয়োগ করা হতো না। বিশেষভাবে যারা বিএনপি জামায়াত ও এসব দলের অঙ্গ সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলো, তাদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর মনোভাব পোষণ করতো স্বৈরশাসক হাসিনা ও তার সরকার। ফলে গত দেড় দশকে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের চাকুরীতে শুধু ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত তরুণ যুবক ও অন্যান্য লোকজন চাকরী পেয়েছে। ফলে অত্যন্ত মেধাবী হওয়া সত্বেও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত বা অনুসারী প্রার্থীরা অত্যন্ত লোভনীয় সরকারী চাকরী থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের মেধা দেশ ও জাতির কোন কাজে আসেনি। এ অবস্থায় হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী ও ডিগ্রিধারী দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। বিশে^র বিভিন্ন দেশ তাদের মেধা জ্ঞান দক্ষতার দ্বারা উপকৃত হলেও এদেশ বঞ্চিত হয়েছে। অপরদিকে সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত চাকরীসহ সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার লাভের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে লাখ লাখ শিক্ষিত বাংলাদেশী তরুণ যুবা হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমানে দেশে বেকার ও অর্ধবেকারের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
অবশ্য শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনামলে অল্প কিছু সংখ্যক প্রার্থী বিভিন্নভাবে সুপারিশ ও বড়ো অংকের অর্থের বিনিময়ে চাকরী পেয়েছেন। চাকরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রার্থীদের তালিকা সরবরাহ করা হতো চাকরী প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে। বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসসহ সকল ক্ষেত্রেই ছিলো এ নিয়ম। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রার্থীদের আগে থেকেই প্রশ্ন দিয়ে দেয়া হতো অর্থাৎ ফাঁসকৃত প্রশ্নে তারা পরীক্ষা দিয়ে সফল হতো। এ বিষয়ে হাসিনা সরকার সম্পূর্ণ অবগত ছিলো। এমনকি সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশেই এটা করা হতো। এজন্য হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস এক স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। শুধু চাকরী নয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রেও ছিলো এ ধরনের দুর্নীতি। মেডিকেলসহ বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার পেতো সরকারী দলের লোকজন। মুক্তিযোদ্ধা কোটার মাধ্যমে হাজার হাজার এমনকি লক্ষ লোকজন এসব সুবিধা নিয়েছে বিগত দেড় দশকে। গত বছর ১৭ আগস্ট ঢাকা পোস্টে ‘ছাত্রলীগ না করলে কেউ কোন চাকরী পায় নাই’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, আওয়ামী লীগের আমলে ছাত্রলীগ না করলে কেউ কোন চাকরী পায় নাই। ছাত্রলীগ না করলে কেউ কোন সুবিধা পায় নাই। যুবলীগ না করলে কেউ কোন কাজ পায় নাই, যুবলীগ আওয়ামী লীগ না করলে সমাজে কোন জায়গা পায় নাই। মসজিদের ইমাম ও মসজিদের কমিটি পর্যন্ত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ ছাড়া করে নাই। ২০১৫ সালে দৈনিক প্রথম আলোতে ‘সরকারী চাকরী করেও তারা ছাত্রলীগে!’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সরকারী চাকরী করলে কেউ ছাত্রলীগ করতে পারেন না। গঠনতন্ত্রের ৫ (গ) ধারায় বলা হয়েছে, যে কোন নিয়মিত ছাত্র ছাত্রলীগের কর্মকর্তা ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্য হতে পারেন? তবে লক্ষণীয় যে, এখন যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের বড়ো অংশই আর নিয়মিত ছাত্র নন।
যা-ই হোক, রাষ্ট্রের চাকরী ক্ষেত্রে রাজনীতিকে টেনে এনে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে স্বৈরাচারী হাসিনা ও তার সরকার তখন তার জনৈক উপদেষ্টাকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে দেখা যায়, ছাত্রলীগের ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলে কাউকে সরকারী চাকরীতে নিয়োগ করা হবে না। তাই চালু করা হয় চাকুরী প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় অনুসন্ধান। এজন্য ব্যবহার করা হয় গোয়েন্দা সংস্থাকে।
দেখা গেছে, কোন প্রার্থীর পরিবারের কেউ যদি বিএনপি বা জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত পাওয়া যেতো, তবে সেই প্রার্থীকে চাকরী দেয়া হতো না। সেই প্রার্থীর স্থলে নিয়োগ করা হতো আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতানেত্রী ও সমর্থকদের। এভাবে বিগত ১৫ ছরে চাকরী ক্ষেত্রে এদেশের মানুষের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে, লঙ্ঘিত হয়েছে তাদের মানবাধিকার। বর্তমান হিতকামী সরকার এই অন্যায় ও অবিচারের অবসান ঘটিয়েছেন। চাকরী ক্ষেত্রে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় অনুসন্ধানের নিয়ম বা বিধান বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা এই মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছি।




