অর্থনীতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ আগস্ট ২০২৫, ৯:৫৪:৪৫ অপরাহ্ন

যারা দেড় দশক অবাধে দুর্নীতি ও লুটপাটের সুযোগ পেয়েছে, তাদের কাছে স্বৈরাচারী হাসিনার সরকার যে প্রিয় ছিলো এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশকে এখন সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুললেও এতে তারা খুশি হবে না, যতোক্ষণ না তারা তাদের আগের চুরি চামারি ও দুর্নীতির অবস্থানে ফিরে যেতে পারছে। যা-ই হোক, অত্যন্ত নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করলে অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছরের শাসনকালে যে অনেক সফলতা অর্জিত হয়েছে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গতকাল এদেশের বিভিন্ন জাতীয় মিডিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের অনেক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, ‘ঘুরে দাড়িয়েছে রিজার্ভ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিলো লুটপাটের শিকার ব্যাংকিং খাত ঠিক করা। এখাতে গত এক বছরে সরকারের সাফল্য অনেক। রিজার্ভ সংকট কাটিয়ে ওঠা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড গড়া এবং খেলাপী ঋণের প্রকৃত চিত্র উন্মোচনে ফিরে এসেছে জনআস্থা। বলা বাহুল্য, কোভিড পরবর্তী সময়ে অতিমাত্রায় আমদানি ব্যয় ও অর্থ পাচারের কারণে ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের সর্বোচ্চ রিজার্ভ দ্রুত নামতে থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে আইএমএফের বিপিএম ৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ দাঁড়ায় মাত্র ২০ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের নানা সকল পদক্ষেপে এক বছরে রিজার্ভ বেড়ে ২৫ দশমিক ০৬ বিলিয়নে উন্নীত হয়। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমান বর্তমানে প্রায় ৩০ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার। গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমদ জনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রিজার্ভ যেখানে ২০ বিলিয়নের নিচে নেমে গিয়েছিলো, সেখানে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা ৩০ বিলিয়নের বেশি হয়েছে, এটা এক বিশাল অর্জন। এছাড়া ড. ইউনুস দায়িত্ব গ্রহণের পরই প্রবাসীদের আস্থা ফিরতে শুরু করে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু নতুন সরকারের উদার নীতি ও প্রণোদনার ফলে রেমিট্যান্স ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে, যা দেশের ইতিহাসে এক অর্থ বছরে সর্বোচ্চ। এই প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, রপ্তানী আয় ও প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহ রিজার্ভ পুনঃগঠনে মূখ্য ভূমিকা রেখেছে। অপর দিকে গত বছর আগস্টে যেখানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিলো ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ২০২৫ সালের জুনে তা কমে এসেছে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ খাদ্য মূল্যস্ফীতি থেকে এসেছে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশে, যা বিগত ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি, একাধিকবার সুদ হার বৃদ্ধি, আমদানির বিধি নিষেধ শিথিল এবং নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক হ্রাস, এসব উদ্যোগ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামাতে কিছুটা সফল হয়েছি। তবে এটা ৩ শতাংশে না নামা পর্যন্ত আমি সন্তুষ্ট নই। আওয়ামী শাসনামলে ব্যাংক খাতে খেলাপী ঋণের প্রকৃত চিত্র গোপন রাখা হয়েছিলো। প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেলে ২০২৫ সালে খেলাপী ঋণের পরিমান দেখা যায় ৫ লাখ ৩০ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ২৭ শতাংশ। ভুয়া জামানত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ভুয়া ঋণ অনুমোদন ও নীতি নির্ধারকদের ব্যর্থতাই এই পাহাড়সম ঋণের দায়ী। এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের লাগাম বা রাশ টেনে ধরেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে গত এক বছরে। অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক নতুন পদক্ষেপ ও বিদ্যমান কিছু ব্যবস্থার পুনর্মুল্যানের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে সারা দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন রাখতে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বৈরাচারী হাসিনার সরকার ক্ষমতায় থাকলে গত এক বছরে যে একাধিক বার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণকে শোসণ করতো, এতে কোন সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। রেলওয়ে খাতে সুষ্ঠু পদক্ষেপের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে।
বলা যায়, দেশের রাজনৈতিক ও আইন শৃংখলা ব্যবস্থায় শৃংখলা ফিরিয়ে আনাতে অন্তর্বর্তী সরকার তেমন সফল না হলেও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে এই সরকার যে যথেষ্ট সফল হয়েছে, এতে কারো তেমন কোন দ্বিমত নেই। অবশ্য স্বৈরাচারের দোসররা স্বৈরশাসনামলে ১৮০-২০০ টাকার পেঁয়াজ বর্তমানে ৬০/৬৫ টাকায় এবং ৮০-১০০ টাকার আলু ২৫/৩০ টাকায় পেলেও বলছে, আগেই ভালো ছিলাম। এসব দুর্বৃত্ত ও নেমকহারামরা বাদে দেশের বাদ বাকী ১৮-২০ কোটি মানুষ অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জিত সফলতার কথা অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করছেন।




