২৭ দিনেই ১০ বার ভূমিকম্প : বাড়ছে ঝুঁকি, সর্বত্র উদ্বেগ
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৫:৫০ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : ভূমিকম্পে বারবার কেঁপে উঠছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থাগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে দেশের আওহাওয়া অফিস বলছে, চলতি মাসের প্রথম ২৭ দিনেই ১০ বার ভূমিকম্প হয়েছে। এগুলোর বেশিভাগ উৎপত্তি আশপাশ অঞ্চলে হলেও অভ্যন্তরে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ শুক্রবারও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে।
এদিন দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি দেশের ভেতরে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে। যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৩। বিগত কয়েক মাসে দেশের ভেতরে আরও বেশ কিছু ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়েছে। দেশের আশপাশেও প্রতিনিয়ত ভূমিকম্প হচ্ছে। যারফলে একধরণের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে জনমনে। বিশেষজ্ঞদেরও আশঙ্কা, এই অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। আর এই ঘন ঘন ভূমিকম্পের মধ্য দিয়ে সেই ঝুঁকির ‘বার্তা প্রকাশ’ করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা বলেন, পৃথিবীতে প্রতিদিন অন্তত অর্ধশতাধিক ভূমিকম্প হয়। তবে এগুলোর অনেকগুলোই আমরা টের পাই না বা অনুভব হয় না। তবে এই ছোট কম্পনগুলো একেকটা বড় ভূমিকম্পের বার্তা।
এই ভূতত্ত্ববিদ আরও বলেন, ‘মূলত যেখানে একবার ভূমিকম্প হয়, সেখানেই আবার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। কারণ সেখানে শক্তি জমা আছে বলে ধরে নেওয়া হয়, এই বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও চিহিৃত করা হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব সিলেট অঞ্চল থেকে দক্ষিণের কক্সবাজার তথা চট্রগ্রাম অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য ব্যাপক ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এই অঞ্চলে অতীতে বড়মাত্রা ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। এই অঞ্চলের মাটির নীচে যে পরিমাণ শক্তি জমায়িত রয়েছে তাতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছুই নয়। এটি যখন তখনই ঘটতে পারে।’
চলতি মাসে যত ভূকম্পন :
ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই দেশের মানচিত্রে ভূমিকম্পের এক ধারাবাহিক চিত্র ফুটে উঠেছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি রিখটার স্কেলে ৩ মাত্রার কম্পনের মাধ্যমে এই মাসটি শুরু হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায়।
এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পর পর দুবার কেঁপে ওঠে দেশ। এদিন ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। পরে রাতে মিয়ানমারে কেন্দ্র করে আরও দুটি কম্পন হয়।
৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি পুনরায় সিলেট অঞ্চলে ৩ দশমিক ৩ ও ৪ মাত্রার দুটি কম্পন আঘাত হানে। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। এভাবে ধারাবাহিকভাবে মাসজুড়ে ১০টি ভূমিকম্পের সাক্ষী হলো দেশবাসী।
গত বৃহস্পতিবারও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূকম্পন অনুভূত হয়। ইএমএসসি তাদের ওয়েবসাইটে জানায়, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম রাজ্যে, যা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের খুব কাছেই অবস্থিত।
বুধবার রাতেও এক দফা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ১। মিয়ানমারের সাংগাই অঞ্চলের মনিওয়া শহর থেকে প্রায় ১১২ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে এবং মাওলাইক শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ছিল এই কম্পনের উৎপত্তিস্থল।
আবহাওয়া অধিদফতরেরর সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের ডাটা :
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ডাটা অনুযায়ী, পরবর্তিতে ৯ ফেব্রয়ারি (৩.৩ মাত্রা, ঢাকা থেকে ২২১ কিলোমিটার দূরে), ১০ ফেব্রুয়ারি (৪.০ মাত্রা, ঢাকা থেকে ২১৪ কিলোমিটার দূরে), ১৯ ফেব্রুয়ারি (৪.১ মাত্রা, ঢাকা থেকে ১৮৭ কিলোমিটার দূরে), ২০ ফেব্রুয়ারি (৩.৬ মাত্রা, ঢাকা থেকে ১২৮ কিলোমিটার দূরে), ২৩ ফেব্রুয়ারি (৪.৪ মাত্রা, ঢাকা থেকে ২৫২ কিলোমিটার দূরে) ও ২৫ ফেব্রুয়ারি (৫.১ মাত্রা, ঢাকা থেকে ৪৬২ কিলোমিটার দূরে) বাংলাদেশ ও আশপাশ অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছিল।
বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা :
তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ। এরমধ্যে কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে মেঘনা নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে আন্দামানের পাশ দিয়ে দক্ষিণে যদি একটা রেখা কল্পনা করা হয়, তবে এই এলাকাটা হচ্ছে দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল। আর এই দুটি প্লেটের মধ্যে পূর্ব দিকেরটা হচ্ছে বার্মা প্লেট। আর পশ্চিমেরটা হচ্ছে ইন্ডিয়া প্লেট। এই সংযোগস্থলের উপরের ভাগটা অর্থাৎ সুনামগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে পূর্বে মনিপুর, মিজোরাম পর্যন্ত- এই অঞ্চলটি ‘লকড’ হয়ে গেছে অর্থাৎ এখানে শক্তি জমা হয়ে আছে।
বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা বলেন, এই অঞ্চলে অতীতে অনেক বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে। ১৮৯৭ সালে গ্রেট ইন্ডিয়া ভূমিকম্প সংঘঠিত হয়েছে, যেটি ছিল ৮.৫ মাত্রার। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে বিরাট ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৭৬২ সনে আমাদের টেকনাফ আইল্যান্ডের দক্ষিণপাশে একটি ভূমিকম্প সংঘঠিত হয়েছিল, যারফলে টেকনাফ আইল্যান্ড কয়েকমিটার পর্যন্ত উচু হয়ে গিয়েছিল এক নিমিষে।





