জ্বালানি সংকটে নানাবিদ চাপে কৃষকরা
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ৯:১১:৪১ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট: এমনিতেই সারাবছর নানান কারণে কৃষকদের শঙ্কা আর চাপে দিন পার করতে হয়। সার সংকট, পোকার আক্রমণ, বন্যা ইত্যাদির সাথে প্রতিবছর কোনো না কোনো ভাবে তাদের মোকাবেলা করতে হয়। এরবাইরে আছে ন্যায্য মূল্য পাওয়া, সময়মতো পণ্য বিক্রির শঙ্কা। এসব চাপের সাথে সম্প্রতি শুরু হয়েছে জ্বালানি সংকটের চাপ।
বর্তমানে দেশজুড়ে বোরো ধানের সবুজে মোড়া বিস্তীর্ণ মাঠ এখন প্রাচুর্যের প্রতিশ্রুতি দেখাচ্ছে। কিন্তু এই সবুজের আড়ালেই জমছে অনিশ্চয়তার মেঘ। মাঠে ফসল দাঁড়িয়ে থাকলেও তা ঘরে তুলতে গিয়ে কৃষক পড়ছেন জ্বালানি সংকট, বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, কৃষিযন্ত্রের সংকট ও শ্রমিক ঘাটতির মতো চতুর্মুখী চাপে। এর মধ্যেই আগাম বন্যার পূর্বাভাসে আগেভাগে ধানকাটার তাগিদ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি বিভাগ। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। আর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তায়।
চলতি এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সপ্তাহের মধ্যে সারাদেশে ধান কাটা পুরোদমে শুরু হবে। তবে বৃষ্টির কারণে এবার কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। এর সঙ্গে শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখী এবং জ্বালানি সংকট যোগ হয়ে পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার শঙ্কা বাড়ছে। পানি বাড়তে থাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড কৃষকদের ৮০ শতাংশ পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছে। কৃষি বিভাগও একইভাবে দ্রুত ধান কাটার তাগিদ দিচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য ক্ষতি কমানো যায়। কারণ এই অঞ্চলে ধান কাটার সময় খুবই সীমিত, সামান্য বিলম্বেও ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এদিকে, গত দুই মাস ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কৃষকদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় জ্বালানি। এর মধ্যেই সরকার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি এসেছে সেচ, রোগবালাই দমন, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের ব্যস্ত মৌসুমে- যেখানে প্রায় সব কাজই ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে কৃষকের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা বেড়েছে। আগে যেখানে বছরে ডিজেলে খরচ হতো প্রায় ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬ কোটি টাকায়। এই বাড়তি ব্যয় সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার প্রভাব পড়বে চালের বাজারেও।
মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় সেচ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে, তাপপ্রবাহের এই সময়ে জমিতে পানির ঘাটতি হলে ধানে চিটা হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু ডিজেল সংকটে অনেক কৃষক নিয়মিত সেচ দিতে পারছেন না।
কৃষকদের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে মৌসুমজুড়ে ৩৫ থেকে ৪০ লিটার ডিজেল লাগে। নতুন দামে এতে বিঘাপ্রতি খরচ প্রায় এক হাজার টাকা বেড়েছে। কোথাও চাষাবাদের খরচ ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকার বেশি হয়েছে। গাইবান্ধার এক কৃষক জানান, গত বছরের ১২ হাজার ৫০০ টাকার খরচ এবার বেড়ে ১৮ হাজার টাকার বেশি হয়েছে। এখনও ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন বাকি থাকায় চূড়ান্ত ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এদিকে, সেচ ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষিযন্ত্রের ভাড়াও বাড়ছে। শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে কৃষকরা কম্বাইন হারভেস্টারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন, যা সম্পূর্ণ ডিজেলচালিত। থ্রেশার, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও পরিবহন ব্যবস্থাও জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি না থাকায় যন্ত্র মাঠেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে কাজ বিলম্বিত হচ্ছে এবং ব্যয় বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের কৃষি খাত এখন বড় পরিসরে ডিজেলনির্ভর। দেশে মোট ডিজেল ব্যবহারের প্রায় ২০ থেকে ২৪ শতাংশ কৃষিতে ব্যবহৃত হয়, আর সেচ কার্যক্রমের প্রায় ৮০ শতাংশই পরিচালিত হয় ডিজেলচালিত যন্ত্রে। সেচ মৌসুমে মোট ডিজেলের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ১২.৫ লাখ টন, যার মধ্যে শুধু সেচেই লাগে ৭.৬ লাখ টন। দেশে প্রতিদিন কৃষি খাতে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৭ হাজার টন। দেশে বর্তমানে প্রায় ২১ লাখের বেশি ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে সেচ পাম্পের সংখ্যা ১২ লাখের বেশি এবং ১০ হাজারেরও বেশি কম্বাইন্ড হারভেস্টারসহ বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি জ্বালানিনির্ভর। ধান উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ- জমি প্রস্তুত, রোপণ, সেচ, কাটা, মাড়াই, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ- সবকিছুতেই ডিজেলের ব্যবহার অপরিহার্য। ফলে জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তা পুরো কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
হাওরাঞ্চলে সংকট আরও প্রকট। দেশের মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ এই অঞ্চলেই উৎপাদিত হয়। কিন্তু অকাল বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ইতোমধ্যে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত ধান কাটতে প্রয়োজনীয় সাড়ে সাত হাজার হারভেস্টারের বিপরীতে সচল রয়েছে মাত্র তিন হাজার। আরও প্রায় ৪৪৫টি যন্ত্র অচল। অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় যন্ত্র ব্যবহারও সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদন খরচ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির কারণে খরচ শুধু বাড়ছেই। সরকারি হিসাবে, গত মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ ছিল ২৭ টাকা, যা এবার আরও বাড়বে। তবে উৎপাদন খরচ বাড়লেও সরকারি সংগ্রহ মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে। সরকার চলতি মৌসুমে ধানের দাম প্রতি কেজি ৩৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা, আতপ চাল ৪৮ টাকা এবং গম ৩৬ টাকা দরে সংগ্রহ করবে। ধান সংগ্রহ শুরু হবে ৩ মে এবং চাল ১৫ মে থেকে; কার্যক্রম চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। কৃষকদের অভিযোগ, এই দামে উৎপাদন খরচ উঠছে না- অনেক ক্ষেত্রে এক মণ ধানের দামে এক দিনের শ্রমিকের মজুরিও হচ্ছে না।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের অভিযোগ, এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় এক হাজার টাকার বেশি, আর সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। অথচ এ সময় এক দিনের শ্রমিকের মজুরি গুনতে হচ্ছে ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা। তারা বলেন, কৃষকের দুঃখ কেউ দেখে না।
বাংলাদেশে মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। ফলে এই সময়ে উৎপাদন ব্যাহত হলে তা সরাসরি চালের বাজারে প্রভাব ফেলবে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, উৎপাদন কমে গেলে চালের দাম বাড়বে, যা নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বড় চাপ তৈরি করবে এবং আমদানি নির্ভরতা বাড়াতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ না করলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, ভর্তুকি বাড়ানো এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেছেন, অচল হারভেস্টার দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত হারভেস্টার প্রস্তুত রাখা এবং জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। ধান কাটার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জ্বালানি সংকট এখন কৃষকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো সেচ, ধান কাটা ও পরিবহন নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তা শুধু কৃষকের ক্ষতিই নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।




