সরকারের ১০০ দিনে দেশে ৬০৫ হত্যাকাণ্ড : টিআইবি
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ জুন ২০২৬, ৭:১৩:৪৬ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সারাদেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
রোববার ‘নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন’ শীর্ষক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে টিআইবি উল্লেখ করেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গঠিত সরকারের কাছে সুশাসিত, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছিল জনগণ। সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সারাদেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এছাড়া, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৯ জন নারী ও শিশু।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ সময়ের মধ্যে ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বর্তমান সরকারের ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটা নাজুক ছিল। খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, লুটপাট ও অরাজকতার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।”
বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় লোকজনদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
টিআইবির প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায়- নতুন সরকার কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি এখনো সীমিত।
তবে সরকারের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার, মন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়নের ঘোষণা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ। টিআইবির মতে, এসব পদক্ষেপ সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন।
অন্যদিকে, সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত ও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বক্তব্য নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। এতে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টিকে আইনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও টিআইবি বলেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি দমন-সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন বাতিল বা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত উদ্বেগজনক। এতে এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনগত প্রতিষ্ঠানে নতুন নেতৃত্ব নিয়োগে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া— দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
প্রতিবেদনে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন স্তরে ‘এবার আমাদের পালা’ ধরনের মানসিকতার সমালোচনা করা হয়েছে। পুলিশ, প্রশাসন, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে, যা নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর হামলার ঘটনাগুলো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতার বিস্তার দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের জন্য অশনিসংকেত।
সবশেষে টিআইবি বলেছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিন একদিকে সম্ভাবনাময় ও আশাব্যঞ্জক হলেও সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ঘাটতি এখনো উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।





