২ দশকে বাংলাদেশে গরম বেড়েছে ৩ গুণ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ জুন ২০২৬, ৯:১০:৪৫ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশ আগের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। সেইসঙ্গে বাড়তে থাকা এই তাপমাত্রা হয়ে উঠছে আরও বিপজ্জনক। তাপমাত্রা মানবদেহের জন্য অস্বস্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, বছরে এমন দিনের সংখ্যা গত দুই দশকে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশে ‘অনুভূত’ বা ‘ফিলস-লাইক’ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছিল প্রায় ৪৬ দিন। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ দিনে। অর্থাৎ, এমন দিনের সংখ্যা ১৬৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে এই হার কম্বোডিয়া ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশে এত বেশি ছিল না।
এমন তাপমাত্রা যে কেবল অস্বস্তিকর তাই নয়, এই মাত্রায় পৌঁছালে মানবদেহের পক্ষে নিজেকে ঠান্ডা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আর্দ্র পরিবেশে। এর ফলে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়। বিশ্বব্যাংকের ক্লাইমেট চেঞ্জ নলেজ পোর্টালের হিট ইনডেক্স এবং ল্যানসেট কাউন্টডাউনের তাপজনিত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দ্য ডেইলি স্টার এসব তথ্য পেয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য থেকেও দেখা যায় যে, দেশে তাপপ্রবাহ কতটা তীব্র ও বিস্তৃত হয়েছে। ইতোমধ্যে এ বছর একদিনে দেশের ৪০টি জেলায় তাপপ্রবাহ হয়েছে। দিনটি ছিল গত ২ জুন। এর আগে মৌসুমের ছোট আকারের তাপপ্রবাহও হয়েছে প্রায় এক ডজন জেলায়।
২০২৫ সালে তাপপ্রবাহ আরও বিস্তৃত হয়ে একসঙ্গে ৪৯টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল ২০২৪ সালে। সে বছর দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫১টিতে তাপপ্রবাহ হয় এবং শুধু এপ্রিলেই রেকর্ড সংখ্যক দিনে তাপপ্রবাহ ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রকৃত বায়ুর তাপমাত্রার ভিত্তিতে তাপপ্রবাহ নির্ধারণ করে। টানা দুই বা তার বেশি দিন দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে সেটা তাপপ্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে ক্লাইমেট চেঞ্জ নলেজ পোর্টালের ব্যবহৃত হিট ইনডেক্স বা অনুভূত তাপমাত্রা নির্ধারণে বায়ুর তাপমাত্রার পাশাপাশি আর্দ্রতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়, যাতে প্রকৃতপক্ষে কতটা গরম অনুভূত হচ্ছে সেটাও বোঝা যায়।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে তাপঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বৈশ্বিক হিট ইনডেক্সে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা ছিল এমন দিনের সংখ্যায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। কেবল বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল বাংলাদেশের আগে। তবে মরুভূমিপ্রধান এসব দেশের বিপরীতে বাংলাদেশের তাপমাত্রা উচ্চ আর্দ্রতার কারণে আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
উচ্চ আর্দ্রতার কারণে বছরের মধ্যে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি অনুভূত তাপমাত্রার দিনের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে (জুন-সেপ্টেম্বর) দেশজুড়ে আপেক্ষিক আর্দ্রতা নিয়মিতভাবে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশে পৌঁছে যায় এবং কখনো কখনো ৯০ শতাংশেও ওঠে। শীত ও প্রাক-বর্ষায় এ হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম থাকে।
ভারী আর্দ্রতার বাতাসে ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে শরীরের পক্ষে নিজেকে ঠান্ডা রাখা কঠিন হয়। এর ফলে অনুভূত তাপমাত্রা প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ও বিপজ্জনক হতে পারে। আর্দ্রতাজনিত তাপের বৈশ্বিক হটস্পট হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। তবে অতীতে এই পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সহনীয় ছিল। কিন্তু গত ১৫ বছরে চরম তাপমাত্রার দিন বেশি ঘন ঘন আসছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০১০-এর দশকে বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৯১ দিন অনুভূত তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ১০০ দিনেরও বেশি সময় এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু তথ্য বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৩০ দিনেরও কম সময় হিট ইনডেক্স ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করত। পরবর্তী প্রতিটি দশকে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং সময়ের সঙ্গে তা বেড়ে এখন প্রায় চারগুণ হয়েছে।
২০১০-এর দশকে এই বৃদ্ধির হার হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। আগের দশকের তুলনায় ২০১০-এর দশকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হিট ইনডেক্সের দিন বৃদ্ধির সংখ্যা ৩০০। ২০২০-এর দশকেও এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। এই দশকে বছরে গড়ে এমন দিনের সংখ্যা প্রায় ১০৮। আঞ্চলিক চিত্রেও দেখায়, এই পরিবর্তন কতটা বিস্তৃত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই খুলনা বিভাগের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি। সেখানে ১৯৫০-এর দশকে বছরে গড়ে প্রায় ৫১ দিন অতিরিক্ত তাপমাত্রা থাকলেও ২০২০-এর দশকে তা বেড়ে প্রায় ১৩২ দিনে পৌঁছেছে। ঐতিহাসিকভাবেই চট্টগ্রাম বিভাগে অন্যান্য বিভাগের তুলনায় তাপমাত্রা কম থাকত। কিন্তু, এখন সেখানেও অতীতের সবচেয়ে উষ্ণ অঞ্চলগুলোর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকে।
ল্যানসেট কাউন্টডাউনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার মৃত্যুর মধ্যে চারটির বেশি ঘটেছে তাপমাত্রাজনিত কারণে। আগের ১২ বছরের তুলনায় এই হার ৩৩ শতাংশ বেশি।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হিট ইনডেক্সযুক্ত দিনের সংখ্যা আরও বাড়বে। মাঝারি বা ‘মিডল-অব-দ্য-রোড’ জলবায়ু পরিস্থিতির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতি বছর এ ধরনের অতিরিক্ত ৩২টি দিন দেখা যেতে পারে। এই পূর্বাভাসে ধরা হয়েছে, সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন মধ্য শতাব্দী পর্যন্ত অতীতের ধারা অনুসরণ করবে এবং এরপর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।
এমনকি পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো হলেও, অর্থাৎ ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব নেট-শূন্য কার্বন নির্গমনে পৌঁছালেও বাংলাদেশে বছরে অন্তত অতিরিক্ত ২৩ দিন তাপমাত্রা থাকবে ৩৫ ডিগ্রির বেশি। আর জীবাশ্ম জ্বালানির এমন উচ্চমাত্রার ব্যবহার একইভাবে চলতে থাকলে এই সংখ্যা ৪১ দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রবিউল আউয়াল এই চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বৈশ্বিক তাপমাত্রার বৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ জলবায়ু পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশক এই প্রবণতা চলতে থাকবে।





