যুদ্ধ গড়াল ১০০ দিনে : হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ জুন ২০২৬, ৭:১৭:২১ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। রোববার সেই যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হলো।
একদিকে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে সংঘর্ষও পুরোপুরি থামেনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ মার্কিন জনগণের কাছে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে এটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগেই বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে বোমা হামলার বিরোধিতা করছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও সেই চিত্র বদলায়নি। অনেক ভোটার মনে করছেন, এই যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক শিবলি তেলহামি বলেন, ‘এটা এখন মোটামুটি স্পষ্ট যে খুব কম মার্কিন নাগরিকই মনে করেন যে ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো লাভ হচ্ছে।’
মার্কিন জনসমর্থনের এই ঘাটতি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, যুদ্ধ নিয়ে মানুষের অসন্তোষ নিজ দেশে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আশা করছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। তারা সফল হলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের বাকি সময়ের রাজনৈতিক কর্মসূচির বড় অংশই বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ পোল’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ মার্কিন ভোটার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জিতবে বা ইতিমধ্যে জিতেছে।
এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বারবার করা বিজয়ের দাবির ওপর জনগণ পুরোপুরি আস্থা রাখছে না।
জরিপে আরও দেখা গেছে, রিপাবলিকান ভোটারদের ৩৩ শতাংশসহ মোট ভোটারের বেশির ভাগ মনে করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাব বেশি ফেলেছে।
অন্যদিকে জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাব নেতিবাচকের তুলনায় ইতিবাচক বেশি। শিবলি তেলহামির কাছে জরিপের এই ফলাফল ‘বিস্ময়কর’।
তিনি বলেন, ‘রিপাবলিকানদের মধ্যেও এখন এই ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বয়স্ক ও তরুণ-উভয় বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যেই এই মনোভাব দেখা যাচ্ছে। এটি ট্রাম্পের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।’
অব্যাহত অবরোধ :
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি, বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হন।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। একই সঙ্গে দেশটি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
গত এপ্রিলের শুরুতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধও বহাল রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি রেখেছে।
ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, দুই পক্ষ একটি সমঝোতার কাছাকাছি রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটানোর মতো কোনো বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হয়নি।
যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘর্ষ না ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ সম্পর্কে মানুষের ধারণায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।
ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের (আইজিএ) কর্মসূচি পরিচালক জনাথন গাইয়ারের মতে, এটি এখন একটি ‘অত্যন্ত অজনপ্রিয়’ যুদ্ধ। তিনি বলেন, ‘রিপাবলিকানদের মধ্যে যুদ্ধের সমর্থন ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় কিছুটা বেশি। কিন্তু রিপাবলিকানদের মধ্যেও যে ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে, সেটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।’
গত মাসে আইজিএ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্প যেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তা সমর্থন করেন না। এদের মধ্যে ২১ শতাংশ ছিলেন রিপাবলিকান। মাত্র ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ করেছে।
সাধারণত ভোটারদের অগ্রাধিকারের তালিকায় পররাষ্ট্রনীতি খুব ওপরে থাকে না। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর। ফলে তাঁরা এখন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বেশ সচেতন হয়ে উঠছেন।
আইজিএর জরিপে অংশ নেওয়া ৭৯ শতাংশ ভোটার বলেছেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে। তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকান, ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র— সব ধরনের ভোটারই রয়েছেন।
‘আমি মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরোয়া করি না’ :
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে বরাবরই খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। তিনি প্রায়ই শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির দিকটি দেখান।
ট্রাম্পের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার লক্ষ্য পূরণে অর্থনৈতিক কষ্ট সামান্য মাত্র। যদিও তেহরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
গত মাসে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মার্কিন নাগরিকদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভাবি না। আমি কারও কথাই ভাবি না। আমি শুধু একটি বিষয় নিয়ে ভাবি- ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেওয়া যাবে না।’
ট্রাম্প আরও বলেন, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনও তাঁর ইরাননীতি নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখছে না।
তবে শিবলি তেলহামির মতে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিষয়টিকে গুরুত্বহীন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন, যাতে ইরান মনে না করে যে তিনি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া।
ৃ




